মাদকাসক্তি মানবজীবনের একটি ভয়াবহ ব্যাধি। মানবসমাজ যখনই ধ্বংসের দ্বারগোড়ায় এসে উপনিত হয়েছে তখনই মাদকের কালো থাবায় আক্রান্ত হয়েছে। আইহ্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগে রসুলের আগমন ঘটলে তিনি দেখলেন সেই সমাজেরও একই হাল। সমাজ মাদকের কালো থাবায় আক্রান্ত। মদ খেয়ে মানুষ চুর হয়ে পড়ে থাকতো। মদ ব্যবসা ছিল অন্যতম লাভজনক ব্যাবসা। মাদক সমাজের জন্য এত অধিক ভয়াবহ যে একটি সমাজের জনগণ যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তখন তাদের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তির ঘাটতি হয়, লোপ পায়। মাদকে পুড়ে পুড়ে তাদের জীবন শেষ হয়ে যায়। সেই পোড় খাওয়া মানুষগুলিকে নিয়ে সমাজ-সভ্যতা নির্মাণের কথা চিন্তাও করা যায় না। সমাজ সভ্যতা নির্মাণের জন্য যে অবশ্যম্ভাবী কাজগুলো রয়েছে সেগুলো তাদের, মাদকে আক্রান্ত মস্তিস্ক ও দেহ, দ্বারা করানো সম্ভব হয় না। তাদের দিয়ে মানবজাতির কোন কল্যাণ তো হয়ই না বরং তারা সমাজের বোঝা স্বরূপ সমাজের সম্পদ ধ্বংস করে এবং পশুর চেয়েও নিকৃষ্টভাবে জীবনকাল অতিবাহিত করতে থাকে।
.
আল্লাহর রসুলের জীবনীতে আলোকপাত করলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই, তিনি কিভাবে মাদকের কালো থাবা থেকে তৎকালীন সমাজকে উদ্ধার করেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম পুরো জাতিকে তওহীদের দিকে ডাক দিলেন। তিনি পুরো জাতিকে একটি কথার উপর ঐক্যবদ্ধ করলেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম মানবো না। এই একটি কথার উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর ধীরে ধীরে সমাজের মানুষগুলোর মধ্যকার আন্তঃকলহ হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, রেষারেষি দূর হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ স্থপিত হলো। এই শান্তিপূর্ণ সমাজের প্রভাব পড়লো মাদকের উপর। শত শত বছরের কাল পরিক্রমায় মাদকের প্রতি জাতি এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিল যে ঘরে ঘরে মাদক ব্যাবসায়ী, মাদকাসক্ত ও মাদকের সাথে সম্পৃক্ত সদস্য পাওয়া যেত। এমনকি তাদের মধ্যে অনেকেই সমাজের কর্তৃত্বের আসনেও আসিন ছিলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহর রসুল উপলব্ধি করলেন, যে সমস্যা একদিনে এত বৃহৎ আকাড় ধারণ করে নি সেই সমস্যার পরিত্রাণও একদিনেই পাওয়া সম্ভব নয়। এই শত শত বছরের ব্যাধিকে শরীর থেকে প্রতিকার করতে হলে ধীরে ধীরে পদক্ষেপ নিতে হবে। আল্লাহ তাই এ সমস্যা থেকে সমাধানের জন্য যথাযথ দিক নির্দেশনা প্রেরণ শুরু করলেন। প্রথমে তিনি আয়াত প্রেরণ করলেন, “তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। হে নবী! আপনি বলে দিন, এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড় (সুরা বাকারা ২১৯)।” এর মাধ্যমে তিনি প্রথমেই মানুষের বিবেককে নাড়া দিলেন। তিনি তাদের সামনে পরিষ্কার করে দিলেন যে মাদকের মধ্যে ভালো ও খারাপ উভয় উপাদানই বিদ্যমান তবে ভালোর তুলনায় খারাপের মাত্রাই বেশি। এর ফলে মানুষ মাদকের ভালো খারাপ বিষয়টি বুঝতে শুরু করলো এবং মাদকের প্রতি তাদের মনে একটি ঘৃণার সৃষ্টি হলো।
.
এরপর আরো কিছুদিন অতিবাহিত হলো এবং সমাজের দ্রæত পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের মন মানসিকতারও ব্যাপক পরিবর্তন হতে লাগলো। তখন আল্লাহ আয়াত নাযিল করলেন, “হে মো’মেনগণ তোমরা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় সালাহর (নামাজের) নিকটবর্তি হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে সক্ষম হও যা তোমরা বলছো (সুরা নিসা ৪৩)।” প্রথমে আল্লাহ একটি রেখা টেনে দিয়েছিলেন এবার এই আয়াত নাযিলের মাধ্যমে তিনি একটি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করলেন। নির্দেশ দিলেন, অন্তত সালাহর যে পাঁচ ওয়াক্ত সময় সেই সময়টুকু মাদক থেকে মুক্ত থাকতে হবে। এর ফলে তাদের চেতনায় পুনরায় ধাক্কা লাগলো। মাদকের বিরুদ্ধে তাদের চিন্তা-চেতনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসলো। রসুলাল্লাহর আদর্শের সংস্পর্শে মানুষ ক্রমেই সোনার মানুষে পরিণত হতে লাগলো। একটি পর্যায় আসলো যখন সমগ্র জাতি আল্লাহর প্রতিটি হুকুম মেনে নেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গেল। তখন আল্লাহ আয়াত প্রেরণ করলেন, “হে মো’মেনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, স্থাপনকৃত মূর্তি ও ভাগ্য নির্ধারক তীর অপবিত্র ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা ইহা হতে দূরে থাক, যেন তোমরা সফলকাম হতে পার (সুরা মায়িদা ৯০)।” আল্লাহ মাদককে হারাম ঘোষণা করলেন। রসুলও বললেন, “তুমি মদপান করবে না কারণ ইহা সকল মন্দের চাবিকাঠি (ইবনে মাজাহ)।” রসুল আল্লাহর এই ঘোষণার বাস্তবায়ন ঘটালেন। সমাজ থেকে সকল মাদক নির্মূল করার উদ্যোগ নেয়া হলো। যারা ঘরের মধ্যে পরে খাবে বলে মদ গচ্ছিত রেখেছিল তারা সেগুলো মদিনার রাস্তায় ঢেলে দিলেন। মদ খাওয়ার বিশেষ পাত্র ভেঙ্গে ফেললেন যাতে মদ খাওয়ার প্রতি আকাঙ্খা না জন্মে। পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে কেউ যদি মদ বা মাদক গ্রহণও করতো তবে তাকে শাস্তিস্বরূপ বেত্রাঘাত করা হতো। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই জাজিরাতুল আরব মদ বা মাদকজাতীয় বস্তুর থাবা থেকে মুক্ত হয়ে গেলো।
.
এখন আসি বর্তমানে। ফিলিপাইনে যে ঘটনাটি ঘটে গেল। সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকাশ্যে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। মাদকের সাথে সম্পৃকতা রয়েছে এই কারণে সাড়ে তিন হাজারের মতো মানুষকে হত্যা করা হলো। জাতিসংঘও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এমনই ভয়াবহ অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে যে বিচারের আওতায় এনেও কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না। যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদক নির্মূল করার কথা তারাও এর সাথে জড়িত। আবার এই মাদকব্যবসায়ীরাই সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও নেতা পর্যায়ের লোক। এমনকি শিক্ষিত জনগোষ্ঠি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীরাও এর থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। সমগ্র পৃথিবী আজ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ সংকটের মতো মাদক নিয়েও যথেষ্ঠ চিন্তিত। আমাদের সরকারও, ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ এই শ্লোগান দিয়ে, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তার মানে দেখা যাচ্ছে বড় শত্রু এখন অস্ত্রধারী নয়, সবচেয়ে বড় শত্রু এখন মাদক ব্যবসায়ী। তারা মাদকের থাবায় সমাজকে পরিচালিত করছে ও সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বহু সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে, বহু নারী বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছে, বহু খুন হচ্ছে। বহু যুবক তাদের সোনালী যৌবনকে নষ্ট করছে মাদকের নেশায়। কোন জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার এ এক সুদূর প্রসারী চক্রান্ত। বাহ্যিকভাবে অস্ত্রসস্ত্র ও অভ্যান্তরীনভাবে মাদক। এর ফলে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যাবে, জাতি আর দাঁড়াতে পারবে না। জাতির অগ্রগতি, উন্নতি, প্রগতি থেমে যাবে। জাতির জনগণের মধ্যে চিন্তার আড়ষ্ঠতা দেখা দিবে।
তাহলে মাদক নিরাময় করে জাতিকে উদ্ধারের উপায় কী? কিভাবে এ মাদককে দমন করা যায়? সরকারের কাছে শক্তি রয়েছে এবং সরকার সেই শক্তির প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। কিন্তু আমরা হেযবুত তওহীদ বলছি শুধু শক্তি দিয়ে হবে না। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে রসুল কিভাবে সমাজ থেকে মাদককে নির্মূল করেছিলেন। এখন আমাদেরও সেই একই কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হবে। পুরো সমাজটাকে সর্বপ্রথম তওহীদের ভিত্তিতে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন নেতার অধিনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সেই নেতা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন সে সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ করতে হবে। মাদকের কোন হীতকাঙ্খী থাকতে পারবে না। প্রশাসনিক কোন ব্যক্তিবর্গ এর সাথে জড়িত থাকতে পারবে না। যদি থাকে তবে মাদক নির্মূল কখনই সম্ভব নয়।

