আজ মানবতা শুধু কলমের লেখায়, মানবতা আজ বক্তব্যের মাঝে। আজ মানবতার ব্যবহার নেই। মানবতার চলন নেই। এত অন্যায়, এত অরাজকতা, এত ধর্ষণ, এত নিষ্ঠুরতা। কোথায় ধর্ম? মানবতাধারী মানুষ কোথায়? মনুষ্যধর্মের পালন কোথায়? মসজিদ মন্দির, গীর্জায় মানুষ আছে, ধর্ম নেই। কোথায় আজ স্রষ্টা? তিনি কী দেখেন না? কোথায় আজ ধর্ম? নামাজ রোজা, পুজা-অর্চনা, বাইবেল পাঠ- এগুলো ধর্ম? এগুলোতে মুক্তি? কোথায় মুক্তি? কোথায়?
“কোথায় স্রষ্টা? কোথায়?
তিনি কী মসজিদে, মন্দিরে, গীর্জায়? তবে, দেখা যায় না কেনো?”
আমিতো রোজ স্রষ্টাকে দেখি।
“কীভাবে পেলে দেখা? পথ বলে দাও.... আত্মা দিয়ে দেখব পরমাত্মাকে।”
শোন- নামাজ পড়েছি, রোজা রেখেছি, মন্দিরে-মসজিদে-গীর্জায় ঘুরে বেড়িয়েছি,
তাঁকে পাইনি;
হৃদয়ের সবটুকু চাওয়া একত্রে করে অশ্রুশিক্ত হয়ে বলেছি- দেখা দাও, সান্নিধ্যে নাও।
হায়, ছিল না! মসজিদ-মন্দির-গীর্জায় ছিল না ঈশ্বর, ছিল না স্রষ্টা।
“এরপর? এরপর কী করলে?”
অন্তরের দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত করে একমনে জপেছি স্রষ্টাকে,
শুনেছি বহু ঋষি মুণি পেয়েছে নাকি এভাবে- রাত কাটিয়েছি
নির্ঘুম; বহুরাত। ঘুরেছি পথে পথে, হাটে-বাজারে, গ্রামে-শহরে
ওয়াজ-মাহফিলে, পুজার মণ্ডপে। তসবির প্রতিটি দানায় দানায়,
রূদ্রাক্ষের প্রতিটি বীজে টিপে টিপে খুঁজেছি। কিন্তু...
“কিন্তু কী?”
তমসায় আচ্ছন্ন নিরাশা ছাড়া কিছুই লাভ হয়নি।
রমজানে ক্ষুধা তেষ্টায় কাতরাতে কাতরাতে ঝাঁপসা নয়নে খুঁজেছি,
লাইলাতুল কদরে ডুকরে কেঁদেছি; লক্ষ্মীবারে উপবাস থেকেছি।
শিবসেনা হয়ে বিধর্মীদের উপর চড়াও হতে চেয়েছি, মাওলানার মুখের
তেজোদীপ্ত কণ্ঠের ‘আল্লাহু আকবার’ শুনে কাফেরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত হয়েছি-
শুধু স্রষ্টাকে পাব বলে।
“তাহলে পেয়েছিলে?” না! স্রষ্টা যে সৃষ্টিতে সে গূঢ় সত্য উপলব্ধি হয়েছে।
স্রষ্টা রয়েছে প্রকৃতিতে, স্রষ্টা রয়েছে গাছপালায়, নদীনালায়, পাহাড়ে-পর্বতে;
ঈশ্বর, আল্লাহ রয়েছে আকাশে, রয়েছে বাতাসে, গ্রহ-নক্ষত্রে।
“আর?”
“আর?”
পীচঢালা রাজপথে, অলি-গলির পচা ডোবায়, খালে-বিলে-ঝিলে।
আরো শুনবে? পথশিশুর অশ্রুতে অনুতে-পরমাণুতে,
অত্যাচারী শাসকের নির্মমতায়, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরাচারে।
সমাজতন্ত্রের সীমাবদ্ধতায়, ফ্যাসিবাদের ফ্যাসিজমে।
স্রষ্টা ছিলেন সেই শিশুতে-
যে শিশুর পিতা শিশুর মুখে খাবার দিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল;
স্রষ্টা ছিলেন আইলানে-
যে আইলান ভূ-রাজনীতির খেলায় সাগরে প্রাণ দিয়েছিল।
স্রষ্টা ছিলেন রাকিব-রাজন-নুসরাতে,
যাদের আত্মচিৎকার এখনও আমার কানে বাজে।
হায়রে স্রষ্টা, হায়রে ঈশ্বর,
তিনি ছিলেন সেই সিরিয়ান মায়েদের স্পর্ধায় যারা চালের জন্য সন্তান বিকিয়েছিল,
সেই মায়ের ধৃষ্ঠতায়, যে পরকীয়ার যেরে নিজ সন্তানকে বিষ দিয়েছিল,
ঐ যে, ঐ যে দেখো! ফেলানীর ঝুলে থাকা দেহের প্রতিটি রক্তের ফোঁটায় ফোঁটায় স্রষ্টা।
দেখনি? এই শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানবতাই যে- স্রষ্টা।
সেই স্রষ্টা আজ বন্দী, মানুষ আজ বন্দী।
স্রষ্টার মুক্তি, স্রষ্টার তুষ্টি, মানুষের মুক্তিতে, মানবতার জয়ধ্বনীতে।