সোমবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৮

অনুকরণ নয় অনুসরণ করুন

প্রচলিত ইসলামের ধ্যান-ধারণা মোতাবেক অনেকেই আলেম চিহ্নিত করেন লেবাসের মাধ্যমে। এর ফলে নির্দিষ্ট লেবাসধারী নয় এমন কেউ যদি ইসলামের কোন বিষয়ে পরামর্শ দেন তখন তারা সেই পরামর্শকে গ্রহণ করেন না। তারা কোর’আন, হাদীসের সাথে মিলানো তো দুরে থাক অনেকসময় লেবাস নেই বিধায় তাকে কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত দেয়া হয় না। কিন্তু ইসলামে এ ধরনের নির্দিষ্ট কোন লেবাসের উল্লেখ নেই। নির্দিষ্ট লেবাসকে অনেকে আল্লাহর রসুল (স.) এর সুন্নাহ বলেও ধারণা করে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর রসুলের প্রকৃত সুন্নাহ তাঁর লেবাস কে ঘিরে নয়, তাঁর সামগ্রিক জীবনের কর্মকাণ্ডকে ঘিরে।

মহান আল্লাহ তাঁর রসুলকে প্রেরণ করেছেন হেদায়াহ ও সত্যদীন দিয়ে যাতে তিনি এই দীনকে সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন ( সুরা সফ ৯. সুরা ফাতাহ ২৮, সুরা তওবা ৩৩)। আল্লাহর রসুল জানাতেন মহান আল্লাহ তাঁকে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন সেই কাজ একা একজীবনে করা সম্ভব নয়। এর ফলে তিনি তাঁর আসহাব ও আরবের অন্যান্য সকলকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করলেন। কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এবং লক্ষ্য সম্পর্ক যাতে কারো কোন সংশয় না থাকে তাই তিনি তাঁর আসহাবদের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে সম্মক ধারণা (আকিদা, Comprehensive Concept) প্রদান করলেন। এর ফলে রসুলুল্লাহ থাকাকালীন সময়ে তাঁরা যেমন তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ ছিল তেমনি রসুলুল্লাহর ইন্তেকালের সাথে সাথে তারা সেই লক্ষ্য বাস্তাবায়ন করার জন্য পরিবার-পরিজন রেখে, হেদায়াহ ও সত্যদীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন। একটি পর্যায়ে গিয়ে আকিদা বিচ্যুতির কারণে তাঁরা তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভুলে যায় ও এর ফলে পরবর্তীতে তাদের উপর নেমে আসে আল্লাহর লা’নত। সেই লা’নতের ফল আজও মুসলিম জাতি ভোগ করছে।

আকিদা বিচ্যুতির ফলে এখনও আমরা উল্টো দিকে হাটছি। আমরা রসুলের প্রকৃত সুন্নাহ, দীন প্রতিষ্টার সংগ্রামকে বাদ দিয়ে তাঁর অনুকরণ করায় ব্যস্ত। আমরা তাঁর মত লেবাস পড়ছি, তাঁর মতো দাড়ি রাখছি, তিনি যেরূপ ডান কাত হয়ে ঘুমাতেন সেরূপ ভাবেই অনুকরণ করছি। কিন্তু সেই আসল সুন্নাহ, যার জন্য রসুলকে মহান আল্লাহ এ ধরায় প্রেরণ করেছেন, তার কী হলো? সেই সুন্নাহকে আমরা বহু পূর্বেই ভুলে বসে আছি। আপনি রসুলকে অনুকরণ করতে চাইলে আমার তাতে কোন আপত্তি নেই কিন্তু আপনি যদি আপনার নেতার মূল কাজ বাদ দিয়ে, তাঁকে অনুসরণ করা বাদ দিয়ে শুধু অনুকরণ করে মনে করেন যে আপনি যোগ্য অনুসারী হতে পেরেছেন তাহলে আমি বলব এ আপনার নিছক কল্পনা ছাড়া আর কিছ্ইু নয়। আপনি মোটেও তাঁর প্রকৃত অনুসারী হতে পারেননি, কারণ আপনি তাঁর দেয়া মূল দায়িত্বকে ভুলে বসে আছেন।

ধরুন আপনি বিপ্লবী চে গুয়েভারের অনেক বড় ভক্ত। আপনি নিজেও তার মতই হবার স্বপ্ন দেখেন। তাহলে আপনি কি তার বিপ্লবী জীবনকে বেছে নিবেন নাকি তিনি যেভাবে ঘুমাতেন, যেভাবে লিখতেন, যেভাবে বসতেন, যে কাপড় পরিধান করতেন ইত্যাদির অনুকরণ করবেন? আপনি যদি বিপ্লবী জীবনের গ্রহণের পাশাপাশি এগুলোর অনুকরণ করেন তবে আমার তাতে কোন আপত্তি নেই কিন্তু যদি আপনি মূল কাজ বাদ দিয়ে এগুলো নিয়ে পড়ে থাকেন তবে আমি বলবো আপনার দাবি মিথ্যা। আপনি কখনই তার যোগ্য অনুসারী হতে পারবেন না। আপনার সকল অনুকরণ বৃথা। তিনি কখনই আপনাকে তার অনুসারী হিসেবে স্বীকার তো করবেনই না বরং আপনার জন্য অপমানিত বোধ করবেন।

আমাদের বর্তমান ধার্মিকগণ আল্লাহর রসুলকে ঠিক একইভাবে অপমানিত করছেন। তারা রসুলকে অন্ধ অনুকরণ করে যাচ্ছে তাঁর মূল লক্ষ্যের অনুসরণকে বাদ দিয়ে। দুনিয়ার আর কোন জাতি তাদের নেতাকে এত অপমান করেনি। অতএব আমাদের উপর রসুল যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন সে দায়িত্বের যথাযথ পালন করতে হবে। রসুলের প্রকৃত সুন্নাহকে ধারণ করতে হবে। রসুলের প্রকৃত সুন্নাহর অনুসরণের পর কেউ যদি তাঁকে অনুকরণও করতে চায় তবে এতে আমার কোন আপত্তি নেই কারণ সেটা নিছকই তার ব্যক্তিগত বিষয়। অতএব ইসলামকে যারা ভালোবাসেন তাদের এখন প্রধান কর্তব্য অনুকরণ ত্যাগ করে রসুলের সুন্নাহর অনুসরণ করা।

আমলের পূর্বশর্ত মো’মেন হওয়া

আমাদের মুসলমানদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যে শুধু নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদিই ইসলামের মূল বিষয়। যদি এ সমস্ত আমল ঠিকভাবে করা যায় তাহলেই আল্লাহ খুশি হয়ে জান্নাত দান করবেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে এই আমলগুলো করার জন্য যে বিষয়টি অত্যাবশ্যক সেই বিষয়টি হচ্ছে ঈমান। বুখারী শরীফে রয়েছে ইসলামের মৌলিক বিষয় পাঁচটি। কিন্তু অনেককে প্রশ্ন করলে তারা প্রথমটির কথা বেমালুম ভুলে যান। তারা নামাজ থেকে শুরু করে যাকাত পর্যন্ত এক তালে মুখস্থ বললেও সর্বপ্রথম যে ঈমান, কলেমা, তওহীদ সেটার কথা উচ্চারণ করতেও অনেকে ভুলে যান। কোনো কাজ আপনি তখনই করবেন যখন আপনাকে সে কাজ করার অনুমতি দেয়া হবে বা সেই কাজটি আপনার জন্য প্রযোজ্য কর্তব্য হবে। আপনাকে কেউ একটি কাজের ব্যাপারে নিয়োগ দিলে তারপর যদি আপনি কাজটি করেন তখন আপনি সেই কাজের জন্য প্রতিদান পাবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত না হয়ে কাজ করলে বিনিময় পাওয়া যায় না।

আমাদের সমাজের ধার্মিকরা ঠিক এ কাজটিই করে যাচ্ছেন। তারা খুব নিষ্ঠার সাথে বহুবিধ আমল করে যাচ্ছেন। ফরদ নামাজের সঙ্গে আরো বহু রকম সুন্নত, নফল নামাজ পড়ছেন, ফরদ রোজার সাথে বিভিন্ন দিবসে নফল রোজা করছেন, কোর‘আন পাঠ করছেন, দোয়াকালাম শিখছেন আর উঠতে বসতে, খেতে, ঘুমাতে, প্রাকৃতিক কর্ম সারতে সেগুলোর চর্চা করছেন, ঘড়ি ধরে, তসবিহর দানা গুনে জিকির করছেন। সবই করছেন একটি উদ্দেশ্যে- তাদের সওয়াব হবে আর সেই সওয়াব হাশরের দিন পাল্লায় তোলা হবে। যত বেশি আমল তত বেশি সওয়াব। তারা এভাবে আমল করে করে আমলের পাহাড় তৈরি করে ফেলছেন কিন্তু তাদের এ সকল আমল যে ব্যর্থ সেটা তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। আমাদের এই কথা শুনে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, আমল কবুল হচ্ছে কি হচ্ছে না সেটা আপনি কী করে বুঝবেন? আপনি সেটা বলার কে? কার কোন আমল কবুল হবে সেটা আল্লাহ পাকই জানেন।

আমি তাদের উদ্দেশে সবিনয়ে বলব, না। আল্লাহ নন, আপনিও বুঝতে পারবেন আপনার আমল কবুলযোগ্য কিনা। ইসলামে অন্ধবিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই, কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই, ইসলামে জ্ঞানের আলোকবঞ্চিত কোনো অঙ্গন নেই। আমরা যে কাজটি যে উদ্দেশ্যে করি সেটা সফল হলেই বলে থাকি যে কাজটি সার্থক হয়েছে। ইসলামের প্রতিটি আমলের এমনিভাবে আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য আছে। যেমন কিছু আমল আছে চরিত্র গঠনের জন্য। নামাজ রোজা ইত্যাদি এ ধরনের প্রশিক্ষণমূলক আমল যা মো‘মেনকে তার জীবনের লক্ষ্য অর্জনের যোগ্যতা প্রদান করে। যখন কেউ সেই যোগ্যতা লাভ করে তখনই তার আমল কবুল হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। আর যখন তা থেকে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যায় না তখন বুঝতে হবে আমল গৃহীত হচ্ছে না। সেই আমল অর্থহীন। সুরা ফোরাকানে ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এই আমলকারীদের কথাই বলেছেন যাদের আমল আল্লাহ বিক্ষিপ্ত ধুলিকণা করে দিবেন। আল্লাহ বলেছেন, নামাজ মানুষকে অন্যায় আর অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। যদি একটি সমাজে লক্ষ লক্ষ নামাজি হওয়া সত্তে¡ও যদি দিনকে দিন অপরাধ বৃদ্ধি পায়, অশ্লীলতার প্রসার ঘটে তাহলে আমরা বুঝতেই পারি যে লক্ষ লক্ষ নামাজির নামাজ কোনো কাজে আসছে না, অর্থাৎ কবুল হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, ইসলামের প্রতিটি আমলের ফলাফল দুই জগতেই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন করণীয় কী? এ সকল আমলই আমাদের জন্য অকল্পনীয় সুখ বয়ে আনতে পারত যদি আমরা ইসলামের মৌলিক বিষয়ের প্রথমটির উপর গুরুত্ব দিতাম। সেই বিষয়টি কী? সেই বিষয়টি হচ্ছে ঈমান, তওহীদ, কলেমা। এই কলেমা মেনে নেয়ার পর একজন মানুষ ইসলামের ঘরে প্রবেশ করে। তখন তার জন্য বিভিন্ন আমল প্রযোজ্য হয়। একটি ছাত্র স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তার জন্য ঐ স্কুলের সিলেবাস, রুটিন, পরীক্ষা, ড্রেসকোড ইত্যাদি প্রযোজ্য হয়। স্কুলে ভর্তি না হয়ে ওসব কারিকুলামের যতই চর্চা করা হোক কর্তৃপক্ষের কাছে সেসব গৃহীত হবে না। একইভাবে তওহীদের চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে একজন মানুষ মো‘মেন হয়। বংশগতভাবে কেউ মো’মেন বা মুসলিম হয় না। আমাদের সমাজের প্রায় সবাই জন্মসূত্রে মুসলমান। তারা মুসলিম বা মোমেন কাকে বলে এ সংজ্ঞাটিও কোর’আনের আলোকে জানেন না, তারা ধরেই নিয়েছেন যে তারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মোমেন মুসলিম হয়েই আছেন। এখন কাজ হচ্ছে নামাজ রোজা ইত্যাদি যত বেশি করা যায়।

অনেকেই ভাবেন আমরা হলাম মুসলিম। যারা একটু বেশি পরহেজগার অর্থাৎ তথাকথিত সুন্নতি লেবাস আর সুরত আছে, আমল আখলাক ভালো, জিকিরে ফিকিরে চলেন তারা হলেন আল্লাহর মো’মেন বান্দা। এজন্য মো’মেন হওয়টা সময়সাপেক্ষ এবং পরিশ্রমের কাজ। তাই তারা একটু বয়স হলে দাড়ি রেখে, লম্বা কোর্তা পরে, ধর্মকর্মে মন দিয়ে মোমেন বান্দা হয়ে যাবেন। কিন্তু তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। মোমেন হওয়ার সঙ্গে আমলের সম্পর্ক নেই। মো’মেন হওয়া হচ্ছে আমলের পূর্বশর্ত, যেমন করে ওজু নামাজের পূর্বশর্ত। আমল করতে করতে কেউ মোমেন হতে পারে না, বরং মোমেন হওয়ার পরই আসে আমলের প্রশ্ন। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে যে কোনো আমলের নির্দেশ দেওয়ার আগেই বলেছেন, হে মোমেনগণ। যারা মোমেন নন, তাদের জন্য এসব আমলের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই, করলেও তা গৃহীত হবে না।

তাই এখন আমাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে মো’মেন হওয়া। মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনের বিভিন্ন জায়গায় মো’মেনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন কিন্তু মো’মেনের সংজ্ঞা দিয়েছেন শুধু একটি আয়াতে। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে বলেন, “তারাই মো’মেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে ও কোন সন্দেহ পোষণ না করে আল্লাহর রাস্তায় জীবন ও সম্পদ দিয়ে সংগ্রাম করে।” এ সংজ্ঞায় আল্লাহ দুটো বিষয়কে অঙ্গীভূত করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনা ও পরেরটি হচ্ছে আল্লাহর রাস্তায় জীবন সম্পদ বাজি রেখে সর্বাত্মক সংগ্রাম করা।

প্রথম অংশ অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনার মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে কলেমার উপর ঈমান আনা। কলেমা অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ এ কথার উপর ঈমান আনা। বর্তমানে এ কলেমার ভুল অনুবাদ করা হয়। ইলাহার স্থলে বাংলা যেখানে হবে হুকুমদাতা সেখানে মাবুদ বা উপাস্য করা হয়। কিন্তু ইলাহ ও মাবুদ উভয়ই আরবি শব্দ ও একটি আরবি শব্দের বাংলা অনুবাদে আরেকটি আরবী শব্দ ব্যবহার করা সমীচীন নয়। কলেমার উপর বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহকে জীবনের সর্বস্তরে হুকুমদাতা হিসেবে মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করে। ব্যক্তিজীবন, সামাজিকজীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন অর্থাৎ সার্বিক জীবনে যেখানে যেখানে আল্লাহর হুকুম রয়েছে সেখানে সেখানে আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম মানবে না। কিন্তু বর্তমানে আমরা, শুধু আমরা নই গোটা মুসলিম জাতিই, আল্লাহর হুকুম সমূহ শুধু ব্যক্তিজীবনে মানছি কিন্তু রাষ্ট্রজীবন এবং সামাজিক জীবনে মানুষের তৈরি তন্ত্র-মন্ত্র মেনে চলছি। এর ফলে আমরা আল্লাহর সাথে স্পষ্ট শিরক করছি যেই শিরকের গুনাহ আল্লাহ মাফ করবেন না বলে তিনি সে কথা কোর’আনে বেশ কিছু জায়গায় স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। কলেমার শেষের অংশ হচ্ছে আল্লাহর রসুলকে শেষ নবী ও রসুল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া।

দ্বিতীয় অংশে জীবন ও সম্পদ দিয়ে সর্বাত্মক সংগ্রাম অর্থাৎ জেহাদ করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যার ফলে অনেকেই জেহাদকে সন্ত্রাসের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। ইসলামের সঠিক আকিদা না থাকার ফলে এ ধরনের ভুল হয়। আবার অনেকে ঘরে বসে নিজের নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করাকে বড় জেহাদ মনে করেন কিন্তু সুরা ফোরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে যারা ন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করবেন তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করাই হবে বড় জেহাদ। এ সংগ্রাম কোন নির্দিষ্ট ধর্ম, গোত্র বা বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, এ সংগ্রাম তাদের সকলের বিরুদ্ধে যারা ন্যায়ের বিপক্ষে অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ সংগ্রাম লেখনী দ্বারা হতে পারে, বক্তব্য দ্বারা হতে পারে। এর চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে যুদ্ধ যা করার এখতিয়ার শুধু রাষ্ট্রের রয়েছে, কোন ব্যক্তি, আন্দোলন বা গোষ্ঠীর নেই। যদি আল্লাহ সত্যদীন অর্থাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকে তবে তা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম করতে হবে আর যদি তা প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা রক্ষার জন্য সংগ্রাম বজায় রাখতে হবে। সর্বাত্মক সংগ্রাম করা মো’মেনের জন্য অত্যাবশ্যক।

অনেকের মনেই আরেকটি ধারণা রয়েছে যে মো’মেন ও মুসলিম মূলত একই জিনিস। কিন্তু ও মো’মেন ও মুসলিম মোটেও এক নয়। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে স্পষ্ট বলেছেন যে, “হে মো’মেনগণ, তোমরা আল্লাহ কে যথাযথ ভয় কর ও মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না (সুরা ইমরান ১০২)।” এই একটি আয়াত থেকে স্পষ্ট যে মো’মেন ও মুসলিম এক বিষয় নয়। আরেকটি জিনিসও এখান থেকে স্পষ্ট যে আগে মো’মেন হতে হবে এর পর মুসলিম। মো’মেনরা আল্লাহর বিধান সার্বিক জীবনে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম হবেন। আল্লাহর বিধান প্রতিষ্টার ফলে সার্বিক জীবনে নেমে আসবে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার। অতএব আমাদের এখন সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে মো’মেন হওয়া। মো’মেন হওয়ার পর আমরা এখন যে সকল আমল করছি সে সকল আমলই আমাদের উপকারে আসবে। এ আমলগুলো আমাদের জান্নাতের স্তর বাড়াতে সহায়তা করবে এবং আমাদের ইহকালেও সম্মানিত করবে। মো’মেন না হয়ে আমাদের এ সকল আমল যতই করা হোক সেগুলো কোনো কাজে আসছে না বরং পণ্ডশ্রম হচ্ছে।

সোমবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৮

নারীদের জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ ইসলামসম্মত

প্রচলিত ইসলামের ধ্যান-ধারণা মোতাবেক নারীদের কারো জানাজায় অংশগ্রহণের অনুমতি নেই, এমন কি স্বামী সন্তানের জানাজাতেও না। কিন্তু প্রকৃত ইসলামের ইতিহাস অন্য কথা বলে। রসুলাল্লাহর ঘনিষ্ঠ সাহাবি সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) যখন এন্তেকাল করেন তখন রসুলাল্লাহর স্ত্রীগণ তাঁর জানাজায় অংশ গ্রহণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তাঁর মৃতদেহ মসজিদে নিয়ে আসার জন্য বলেন। তাঁদের কথা মোতাবেক সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসের (রা.) দেহ মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে নিয়ে আসা হয়। তখন তাঁর জানাজার সালাতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করেন। রসুলাল্লাহর স্ত্রীগণও তাতে অংশগ্রহণ করেন। এ হাদিসটি সহিহ মুসলিম শরীফের জানাজা অধ্যায়ের মসজিদে জানাজা পড়া অনুচ্ছেদের (৩য় খণ্ড) ৬৩ পৃষ্ঠায় রয়েছে।

এ ঘটনাটি থেকে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নারীদেরকে জানাজায় অংশ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্তটি ইসলামের নয়, এই ধ্যান ধারণার জন্ম হয় বহু পরে যখন পর্দা প্রথার নামে নারীদেরকে পেছনে ফেলে রাখার নানা মাসলা-মাসায়েল আবিষ্কার করা হয় তখন। পুরুষ শারীরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায়, সমাজের নিয়ন্ত্রক হওয়ায় তারা চিরকাল চেয়েছে নারীদেরকে পদানত আর আজ্ঞাবহ করে রাখতে। তাদেরকে মানুষের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করাই ছিল সচরাচর সমাজবিধি। তাদেরকে এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সংগ্রাম করে গেছেন সকল নবী-রসুল অবতারগণ। আরবের জাহেলিয়াতের যুগে যে নারীদের কোনো মানবিক মর্যাদা ছিল না, যারা ছিল ভোগের উপকরণ, কন্যা সন্তান হলে পিতার মুখ অন্ধকার হয়ে যেত, তাদেরকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে হত্যা পর্যন্ত করত সেই নারীদেরকে আখেরি নবী পুরুষের পাশাপাশি জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে অবাধ অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছেন। তারা মসজিদে গেছেন, সালাতে, ঈদে, জুমায়, আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছেন, তারা হাসপাতালের পরিচালক হয়েছেন, বাজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, রসুলের সঙ্গে যুদ্ধে গিয়েছেন। যুদ্ধে নারীরা রসদ সরবরাহের দায়িত্ব থেকে শুরু করে ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার হাতে দুর্দান্ত ও বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা রেখেছেন। মুসলিম জাতির বহু নারী ছিলেন দুর্ধষ যোদ্ধা যারা রোমান-পারস্যের প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদেরকে বারবার ধরাশায়ী করেছেন। জেনারেল এ আই আকরামের দ্য সোর্ড অব আল্লাহ গ্রন্থে তিনি উম্মতে মোহাম্মদীর নারীদের বীরত্বগাঁথার বহু বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন তিনি দেরার বিন আজওয়ার এর বোন খাওলা বিনতে আজওয়ারের বীরত্বে কথা বলেছেন। রোমান সম্রাটের কাছে খবর গেল যে মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে কিছু কমান্ডার আছেন যারা শরীরে বর্ম না পরেই যুদ্ধ করেন। তারা ছিলেন মৃত্যুভয়হীন, বেপরোয়া ও শাহাদাতপিপাসু। এদেরকে বলা হতো নেকেড ওয়ারিয়র। দেরার ছিলেন এদেরই একজন। রোমান সম্রাট তাকে জীবন্ত বন্দী করার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন। রোমান বাহিনীর সৈন্যরা অনেক কষ্ট করে যুদ্ধের একটা পর্যায়ে দেরারকে ঘিরে ফেলে এবং তাকে বন্দী করতে সক্ষম হয়। ঐ ময়দানেরই অন্য অংশে যুদ্ধ করছিলেন তারই বোন খাওলা। ভাইয়ের বন্দী হওয়ার সংবাদ যখন খাওলার কানে গেল তিনি কালবিলম্ব না করে একটি প্রশিক্ষিত ঘোড়ায় চড়ে হাতে বল্লম আর খোলা তলোয়ার নিয়ে ছুটে যান অকুস্থলে। গিয়ে তিনি বহুসংখ্য রোমান সৈন্যকে একা পরাভূত করে ভাইকে উদ্ধার করে আনেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ লড়াই দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেন মহাবীর খালেদ। তিনি খাওলাকে ডাকেন এবং তাঁর বীরত্বের জন্য ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এই ছিল মুসলিম উম্মাহর মধ্যে নারীর জায়গা। আর আজকে মসজিদে পর্যন্ত নারীদের প্রবেশাধিকার নেই। তাদেরকে আবৃত করে রাখা হয়েছে কালো কাপড়ে। তাদের সামনে দিবানিশি কেবল তাদের একটা চুলও যদি দেখা হয় তাহলে কী ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে সেই বিবরণ শোনানো হয়। যার পরিণাম এই হয়েছে যে, জাতির অর্ধেক জনগোষ্ঠী অবলায় পরিণত হয়েছে। তারা জাতিরক্ষায় ভূমিকা রাখা তো দূরের কথা, সামান্য বখাটে ছোকড়াদের হাত থেকে নিজেদের ইজ্জতটাও রক্ষা করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। মুসলিম নারী তো এমন ছিল না। কে তাদেরকে এমন জড়বুদ্ধি-অথর্ব বানালো, জাতির বোঝায় পরিণত করল?

আজকে ইসলামের নামে যে সব নারী নিগ্রহকারী ফতোয়ার জাল বিস্তার করা হচ্ছে সেসব দেখে যুক্তিশীল শিক্ষিত মানুষ ভাবছে যে ধর্মগুলোই হলো নারী প্রগতির অন্তরায়। তারা রসুলাল্লাহর সৃষ্ট নারীদের ইতিহাস দেখতে রাজি নয়, দেখার দরকারও তাদের নেই। কারণ তারা বর্তমানে নারীদের আপাদমস্তক কালো বোরকা আর মুফতিদের চাপিয়ে দেওয়া পরহেজগার রমণীর কর্তব্যগুলো দেখেই ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচারের উপাদানগুলো পেয়ে যাচ্ছে। যারা ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারীদের ইতিহাস সম্পর্কে জানেন না, তারা অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে ইসলামবিদ্বেষী হয়ে যাচ্ছেন। এই হচ্ছে ধর্মব্যবসায়ীদের ফতোয়াবাজির নেট ফল। কারো জানাজায় একজন নারী অংশ নিলে সমাজের ক্ষতিটা কী সে প্রশ্নটি কেউ করছে না, বরং ধরেই নিয়েছে যে ইসলামের বিধানগুলো নারীদের জন্য অপমানজনক। কে তাদেরকে বলে দেবে যে, রসুলের যুগের নারীরা এমন কি তার স্ত্রীরাও যে কোনো নারী বা পুরুষের জানাজায় অংশ নিতেন? ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরে ইসলামবিদ্বেষীদের জবাব দেওয়ার কাজটি ছিল আলেম ওলামাদের। কিন্তু সেটি না করে তারা শত শত বছর ধরে, এমন কি আজকের দিনটি পর্যন্ত বেগানা নারীকে দেখলে কী ভয়াবহ গজব জাতির উপর নেমে আসবে সেই ওয়াজেই ব্যস্ত। ফলে আধুনিক নারীরাও ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। তাই যারাই ইসলামকে ভালোবাসেন তাদের সবার দায়িত্ব এখন ইসলামের প্রকৃত রূপটি তুলে ধরা এবং হাজার বছরের ফতোয়ার নিচে চাপা পড়ে থাকা অনাবিল সত্য ইসলামকে মানুষের সামনে তুলে ধরা।

রবিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৮

মানবতার গান




প্রথমে বন্দনা করি সৃষ্টি জগত যাঁর
তার দরবারে মোদের সকল ফরিয়াদ আবদার
সালাম জানাই চোখের মণি মুহাম্মদ রসুল (স.)
তুমিই মোদের আলোর দিশারী, সুরভীত ফুল।
সব শেষেতে সালাম জানাই যামানার এমাম
ধরায় মোরা ধন্য হলাম, পেলাম সম্মান।

রাহমানুর রহিমের মাঝেই শান্তির সূচনা
ত্রিভূবনে তাহার কোনো নেই যে তুলনা
.
আজ দিকে দিকে দেখি শুধু অন্যায় অনাচার
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবারই এক হাল
হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম মোরা সৃষ্টি যে এক তাঁর
আর- সেই মূল কথা ভুলিয়া বিভেদ করি বারেবার।
.
আরশে মোকমে খোদা ভাবিলেন একবার
নিজ খলিফা মানুষ তবে বানাইবেন এইবার
মাটির পুতুলে দিল রূহ ফুঁকিয়া তাঁর
আর- মাটির পুতুল পেল সবার কাছে মান।
.
জ্বীন আযাযিল ছিলো সেথায় মালেয়েক সর্দার
মাটির আদমের জন্য হলো রাজিম ও শয়তান।
সেই ক্ষোভেরই জ্বালায় জ্বলে শপথ নিলো তাঁর
আর-মাটির আদম তাঁকে ভুলে চলবে তাহার সাথ। 
.
তার কথা ভাবিয়া বলেন জলিলু জব্বার
যুগে যুগে হাদি দিয়া দীন পাঠাইবেন তাঁর
দীন মানিয়া লইবে যারা মানবে হুকুম তাঁর
আর- শান্তি সুখে ডুববে তারা রইবে না অনাাচার।
.
যুগের তালে দ্বীন ভুলিলো আদমের সন্তান
শেষ রসুল তাই আসলেন এবার নিয়ে শেষ পয়গাম
দায়িত্ব নিয়ে আসলেন তিনি দীন প্রতিষ্ঠার
আর- দীন প্রতিষ্ঠা হইলে শান্তি মিলিবে আবার।
.
রসুল এসে গড়ে তুললেন জাতি এক নির্ভিক
তারা ন্যায়ের তরে ঐক্যবদ্ধ অন্যায়কে দেয় ধিক
সেই জাতির ঘারে দিলেন তিনি মস্ত দায়িত্ব তার
আর- দুনিয়াজুড়ে আনবে শান্তি দীন দিয়ে খোদার।
.
কিন্তু একটি সময় পরে জাতি ভুলিলো দায়িত্ব তার
দীনের অতি বিশ্লেষণে খোয়ালো দীনের মান
ইবলিস তাই শাসন করে রাজ্য যে আল্লাহর
তাই- ডাকছি মোরা আসুন তবে হোন ঐক্য এবার।
.
এক নেতার অধিনে এবার গড়বো এক জাতি
চলবে হুকুম এক আল্লাহর রইবে না ত্রুটি।
শান্তি এবার আনবো ধরায় ন্যায়ের ধ্বজা ধরে
তাই- হেযবুত তওহীদ ডাকছি মোরা আজি সমস্বরে।
.
এই লক্ষ্যেই আজ মোদের মানবতার গান
মানুষ মোরা সত্য, আর ধর্ম মোদের প্রাণ
মানবজাতি শান্তি পাবে মিলবে পরিত্রাণ
তাই- মেনে নিতে হবে শুধু এক আল্লাহর বিধান।

সোমবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৮

বিরহ ব্যাথা

স্বপনে এসে তুমি, চলে যেও না
চোখের ঐ চাহনিতে, মন কেড়ে নিও না

কবিতা পড়েই, দিন কেটেছে
বুঝি নি কখনও আগে
সখি এলে যে, গ্রীষ্মের রোদ
নরম শীতল লাগে।

সে রোদ আছে শুধু তুমি নেই
এখন আমি কী করি?
বিরহে মরি।

না পারি কইতে, না পারি সইতে
দেখে দেখে খুঁজে ফিরি
চোখ জ্বলে যায়, হৃদয় পোড়ায়
এ জ্বালায় শুধু যে জ্বলি

এ জ্বালা মিটাতে, মনকে বোঝাতে
এখন আমি কী করি?
বিরহে মরি।

কতদিন আমি, রইবো এমন
তুমি বিনে একা থেকে
প্রেমের সুধা, বাঁচাতে পারে
বিরহ আগুন থেকে।

তুমি না এলে, বিরহ কাটে না
এখন আমি কী করি?
বিরহে মরি।


রবিবার, ১ এপ্রিল, ২০১৮

নামাজ নয় তওহীদ জান্নাতের চাবি

ইসলামে স্তম্ভ পাঁচটি। এগুলো হচ্ছে কলেমা, ঈমান বা তওহীদ, সালাহ বা নামাজ, সওম বা রোজা, হজ যাকাত। সর্বপ্রথম কলেমা হচ্ছে ইসলামে প্রবেশের মূল। এরপর বাকিগুলো হচ্ছে আমল। কিন্তু আমাদের সমাজে বর্তমানে একটি ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যে নামাজ জান্নাতের চাবি। কথাটি আল হাদিস হিসাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে, অনেকে এমন কি ভুল করে এটিকে আল কোরআনের বাণী বলেও লিখে থাকেন। আমরা ইসলামের বিষয়ে যখন কোন কথা বলবো তখন আমাদের উচিত কোরআন, হাদিসের পাশাপাশি যুক্তিকেও প্রাধান্য দেয়া। কারণ আল্লাহর রসুল স্বয়ং বলেছেন- দীনের ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি (কিতাবুল শেফা, ভলিউম , পৃষ্ঠা ৮৭)

সালাহ ইসলামে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় কিন্তু সালাহর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তওহীদ। কোরআনে মহান আল্লাহ ৮০ বারের বেশি সালাহ এর কথা বলেছেন কিন্তু তিনি কখনও বলেন নি যে সালাহ না করলে জান্নাত দিবেন না বা জান্নাতের মূল শর্ত সালাহ। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে যতগুলো আয়াতে সালাহর কথা বলেছেন তার প্রতিটি তিনি বলেছেন তাদের যারা তওহীদকে মেনে নিয়ে মোমেন হয়েছেন। আমি এখানে দুইটি আয়াত দিয়ে উদাহারণ দিচ্ছি।আপনি বলে দিন তাদের যারা মোমেন হয়েছে, তারা যাতে সালাহ কায়েম রাখে আমার দেয়া রিযিক থেকে প্রকাশ্যে ব্যয় করে সেদিন পর্যন্ত যেদিন কোন কেনা-বেচা নেই আর কোন বন্ধুত্বও নেই (সুরা ইবরাহিম ১১)এছাড়াও আল্লাহ অপর জায়গায় বলেছেন, “হে মোমেনগণ, তোমাদের জন্য সওম ফরজ করা হয়েছে যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য (সুরা বাকারাহ ১৮৩)কোরআনে মোমেনদেরকে নির্দেশ করে এমন প্রচুর আয়াত রয়েছে। নামাজ কে জান্নাতের চাবি বলা হলেও জান্নাতে যাওয়ার শর্তে আল্লাহ স্পষ্ট তওহীদকে নির্দিষ্ট করেছেন। আল্লাহ কোরআনে বলেন, “হে মোমেনগণ আমি কি তোমাদের এক উত্তম বাণিজ্যের সন্ধান দিব যা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দিবে? তোমরা আল্লাহ তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনবে আল্লাহর পথে সর্বাত্মক সংগ্রাম করবে, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ (সুরা সফ ১০,১১)অপর জায়গায় আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ মোমেনদের থেকে তাদের জান-মাল ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে (সুরা তওবা ১১১)স্পষ্ট যে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশের যে কয়টি শর্ত দিচ্ছেন সে সকল শর্তেই আল্লাহ তওহীদ সর্বাত্মক সংগ্রাম দুটোকে অধিক প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাই কোরআনের বিধানগুলো যদি আমি দেখি তবে এটা স্পষ্ট হয় যে জান্নাতের চাবি বা শর্ত সালাহ হতে পারে না।

এবার হাদিসে আসি। বুখারি শরিফের প্রসিদ্ধ একটি হাদিস, “ওয়াহিব ইবনে মুনাব্বিহ (.) থেকে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞেস করা হল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কী জান্নাতে চাবি নয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই।আল্লাহর রসুল বলেছেন, “যে হৃদয়ে বিশ্বাস করে যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মোহাম্মদ (.) তাঁর রসুল, আল্লাহ তাঁর জন্য জাহান্নাম হারাম করে দিবেন (ওবায়দাহ বিন সোয়ামেত (রা.) আনাস (রা.) থেকে বুখারী মুসলিম)অপর জায়গায় আল্লাহর রসুল স্পষ্ট বলেছেন, “জান্নাতের চাবি হচ্ছে তওহীদ (মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে আহমদ)এরকম আরো অনেক হাদিস রয়েছে যেখানে আল্লাহর রসুল তওহীদকে জান্নাতের মূল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। প্রসঙ্গে বেশ কিছু ঘটনাও রয়েছে।আল্লাহর রসুল একদিন বললেন, যে ব্যক্তি বলল আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই সে জান্নাতে যাবে। কথা শুনে আবু যার (রা.) বলেন যদি সে চুরি ব্যাভিচার করে তবুও জান্নাতে যাবে? রসুলাল্লাহ জবাব দিলেন, হ্যাঁ। সাহাবী বিস্মিত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন, চুরি ব্যভিচার করলেও জান্নাতে যাবে? রসুল জবাব দিলেন, হ্যাঁ সে চুরি করলেও, ব্যভিচার করলেও এমনকি আবু যরের নাক মাটিতে ঘষে দিলেও (বুখারী মুসলিম)ইবনে ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর আমাকে জানিয়েছেন যে, তাঁর কাছে মর্মে বর্ণনা করা হয়েছে রসুলুল্লাহ (.) যখন মুয়াজকে (রা.) দূত হিসেবে পাঠান তখন কতিপয় উপদেশ দেন তাঁর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, “সহজভাবে ইসলামের দাওয়াত পেশ করবে, কঠিনভাবে নয়। তাদের মনে আশার আলো জাগাবে, বীতশ্রদ্ধ করে দেবে না। আহলে কিতাবের একটি গোষ্ঠির সাক্ষাৎ পাবে। ওরা জিজ্ঞেস করবে যে জান্নাতে চাবি কি? তুমি তাদের বলবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- সাক্ষ্য প্রদানই জান্নাতে চাবি (সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৩৩০)অতএব হাদিস মতেও যদি আমি দেখি তবে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র উপায়, জান্নাতে যাওয়ার চাবি, হচ্ছে তওহীদ অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

এবার দেখা যাক এই ধারণাটি যুক্তির নিরিখে কতটুকু টেকসই। আল্লাহ যুগে যুগে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য নবী-রসুল প্রেরণ করেছেন (সুরা ইউনুস ৪৭) প্রতিটি নবী রসুল তাঁদের সম্প্রদায়ের জন্য একটি বাণীই নিয়ে এসেছিলেন আর তা হচ্ছেলা ইলাহা ইল্লাল্লাহ যেমন- আদম (.) এর সময় কলেমা ছিললা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আদম শাফিউল্লাহ’, মুসা (.) এর সময় ছিললা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুসা কালিমুল্লাহ’, ইবরাহীম (.) এর সময় ছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইবরাহীম খালিলুল্লাহএবং সর্বশেষ আমাদের রসুলের সময় ছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ প্রতিটি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই মূল মন্ত্র ছিল একটিই, তওহীদ। শুধু সময়ের পরিবর্তনে রসুলের নামে পরিবর্তন এসেছে। একটি ছোট বাক্স খুলতে চান বা বিরাট বড় রাজ প্রাসাদের সিংহদরজা, আপনার চাবি প্রয়োজন পড়বেই। তাহলে চাবির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যদি সালাহ জান্নাতের চাবি হয় তবে পূর্ববর্তী উম্মাহর উপর বর্তমানের সালাহ ছিল না। তাহলে কী আল্লাহ তাদের জান্নাতে ঢুকাবেন না? প্রথম নবী আদম (.) থেকে শেষ নবী মুহাম্মদ (.) পর্যন্ত সকল নবীর মাধ্যমেই আল্লাহ যে মূলমন্ত্র প্রেরণ করেছেন অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সেটিই জান্নাতের চাবি হওয়া উচিত। মক্কায় আল্লাহর রসুল নবুয়্যাত লাভের ১১ বছর পর সালাহ এর বিধান আসে। তাহলে এই সালাহ আসার আগে কী আল্লাহর রসুলের কোন সাহাবী ইন্তেকাল করেন নি? তারা কী তবে জান্নাতে যাবেন না? অবশ্যই যাবেন কারণ তারা তওহীদকে মেনে নিয়েছিলেন। সর্বশেষ যুক্তি যদি আমি দেই তবে বলবো, ধরুন আপনার কাছে একজন অমুসলিম এসে বললো যে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চায়। তবে আপনি তাকে প্রথমে কোনটি বলবেন? কলেমা পড়তে নাকি সালাহ করতে?

পরিশেষঅজু নামাজের চাবি আর নামাজ জান্নাতের চাবি’- বলে যে হাদিসটি আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে সেটি জয়িফ হাদিস। উক্ত হাদিসটি মুসনাদে আহমদ শরীফ, তিরমিজি মিসকাত শরিফে রয়েছে। কিন্তু হাদিসটি জইফ কারণ এর সনদে দুজন দুর্বল রাবি রয়েছেন যারা হচ্ছেন, সুলাইমান বিন করম আবু ইয়াহিয়া আল-কাত্তাত (আলবানি, মিসকাত হা/২৯৪ এর টিকা দ্রষ্টব্য) আল্লাহর রসুল নিজে যেখানে বলেছেন যেলা ইলাহা ইল্লাল্লাহহচ্ছে জান্নাতের চাবি সেখানে সালাত কে জান্নাতের চাবি বলার কোন কারণ থাকে না। আল্লাহর রসুল কখনই একটি বিষয়ের উপর দুইটি ভিন্ন মতামত দিতে পারেন না। কলেমা বা তওহীদ এই দীনের ভিত্তি এবং সালাত হচ্ছে দীনের খুঁটি। দুইটি একদম ভিন্ন দুটি বিষয়। একটি ঈমান যা ছাড়া ইসলামে আসা অসম্ভব আরেকটি আমল। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি পরীক্ষায় পাশ করার জন্য আপনার ন্যূনতম ৩৩ নম্বর দরকার এরপর আপনি যা পাবেন তা আপনার মান বৃদ্ধি করবে আপনাকে তালিকায় উপরে নিতে সহায়তা করবে। তেমনি তওহীদ হচ্ছে সর্ব প্রথমে যা আপনাকে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করবে পুরস্কারস্বরূপ জান্নাতে ঢুকার জন্য পাশ নম্বর দিবে এরপর হচ্ছে সালাহ, সওম, যাকাত, হজ যেগুলো আপনার জান্নাতের স্তর বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাই আমাদের এখন জান্নাতের মূল চাবিকে হাতে নিতে হবে। তওহীদ অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কথার উপর নিজেদের পারিবারিক, সামাজিক মোটকথায় সার্বিক জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তবেই আমরা হব মোমেন, আমরা হব সফলকাম।

সময় কাটে

সময় কাটে  ঘড়ির কাটার সাথে, যখন হয়না কথা জমে নীরবতা।  দূর বহুদূরের পথ,  তোমার আমার হোক শপথ, একসাথে খুঁজব সব গলি। আকাশের কোটি তারা, নিজ পথে...