মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৭

প্রকৃত স্বাধীনতা

সমগ্র মানবজাতি বর্তমানে প্রায় দুইশতের মতো ভৌগোলিক রাষ্ট্রে বিভক্ত। বহু সংগ্রাম ও রক্তের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণ তাদের স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন করেছে। তারা ভাবছে এটাই প্রকৃত স্বাধীনতা। কিন্তু আসলেই কি তারা স্বাধীন?

মানুষ স্বভাবতই আনুগত্যপ্রবণ। সে কারো না কারো প্রতি অনুগত থাকতে চায় কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুদায়িত্বটি সে অন্যের উপর অর্পণ করে ভারমুক্ত থাকতে চায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে তার আনুগত্য অর্পণ করে থাকে শক্তিমানের প্রতি। এভাবেই নতুন নতুন শক্তির অধীনে সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন সভ্যতা। এ সভ্যতার বিকাশ ও বিবর্ধনের ফলে নতুন নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে নতুন ভাব ও আদর্শের। 

আমরা যদি শুধু আমাদের এ ভারতবর্ষের দিকে তাকাই তাহলেই সহজে বিষয়টি বুঝতে পারবো। প্রচলিত ইতিহাস মোতাবেক ভারতবর্ষে এক সময় আর্যদের শাসন ছিল। পরবর্তীতে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ইত্যাদি রাজবংশের শাসন দেখা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় এক সময় রাজপুত, আফগান, মোঘলরা ভারতবর্ষকে শাসন করে। এ সময়ে তারা ভারতবর্ষকে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো শাসন করে। এরপর ইউরোপ থেকে একদল শকুন উড়ে আসে। তারা ভারতে ব্যবসার নাম করে অনুপ্রবেশ করে ও পরবর্তীতে তাদের মধ্য থেকে ব্রিটিশরা ভারতকে নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করতে সক্ষম হয় ও একে দুইশ বছর শোষণ করে। তাদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন হয়, দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় পৃথিবীতে, একটা পর্যায়ে ভারত ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তারা বিদায় হওয়ার সময় ভারতবর্ষকে তিনটি ভাগে ভাগ করে রেখে যায়, যারা নিজেদের স্বাধীন সরকার গঠন করে। একইভাবে আরো যে সকল জায়গায় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর উপনিবেশ ছিল তারাও একে একে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এভাবে বর্তমানে বিশ্বে অনেকগুলো নতুন রাষ্ট্র তৈরি হয় যারা নিজেদের স্বাধীন বলে পরিচয় দিয়ে থাকে।

তারা নিজেদের ভৌগোলিক সীমানায় স্বাধীন ভাবলেও প্রকৃত অর্থে তারা কেউই স্বাধীন নয়। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের পূর্বতন প্রভু রাষ্ট্রগুলো থেকে রাজনৈতিকভাবে আলাদা হলেও তাদের আইন-কানুন, দণ্ডবিধি দিয়েই এখনও নিজেদের দেশ পরিচালনা করে চলেছে। তাদের অনুদান ছাড়া এই দেশগুলোর অধিকাংশেরই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয় না, বাজেট হয় না। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকেই প্রাণপণে ধারণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে এই দেশগুলো। নিজেদের স্বাধীন ভাবলেও তারা হুকুম মানছে অন্য মানুষের। মানুষকেই তারা প্রভু বলে মেনে চলছে, সুতরাং এটা কখনওই তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। বরং মানুষ যখন স্বাধীনভাবে তার স্রষ্টার হুকুম মানতে সক্ষম হবে তখনই কেবল সে এই পরাধীনতা থেকে মুক্তি পাবে। কেননা স্রষ্টা তার পর নয়, তাই স্রষ্টার অধীনতা মানে পরাধীনতা নয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে স্রষ্টার রূহ বিরাজ করে।

তেমনি আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে এক পিতা-মাতা থেকে সৃষ্টি করেছেন। সে হিসেবে সকল মানুষ একে অপরের ভাইবোন। তারা তখনই পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করবে যখন মানবজাতি আল্লাহকে নিজেদের হুকুমদাতা হিসেবে মেনে নিয়ে তার দেয়া আইন-কানুন দিয়ে নিজেদের জীবনকে পরিচালনা করবে। মানুষ তো কারো না কারো আনুগত্য করবেই, প্রশ্ন হলো সে ন্যায়ের আনুগত্য করবে নাকি অন্যায়ের আনুগত্য করবে। যদি সে তার সার্বিক জীবনে শান্তি পেতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই ন্যায় ও সত্যের অনুগামী হতে হবে, কেবল শক্তির অনুগামী হলে চলবে না। স্রষ্টা স্বয়ং হচ্ছেন ন্যায়ের প্রতীক, তিনি সকল সত্যের উৎস। তিনি কোনো অন্যায় আদেশ করতে পারেন না, কেননা তিনিই একমাত্র স্বার্থের উর্ধ্বে। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন যে কিছু হারানো বা প্রাপ্তির আশায় তাঁকে অন্যায় সিদ্ধান্ত দিতে হবে, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে হবে। মানুষের পক্ষে কখনওই নিরপেক্ষভাবে, স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়কে ভিত্তি করে বিধান দেওয়া সম্ভব হয় না, তারা নিজেদের স্বার্থের অনুক‚লেই সিদ্ধান্ত ও কর্ম করে থাকে। সুতরাং মানুষকে প্রভু মেনে নিলে সে অন্যায়ের প্রতি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

যে কোনো বিধান ভবিষ্যতের জন্যই রচনা করা হয়, আর মানুষ তার ভবিষ্যৎ কিছুই জানে না। কিন্তু স্রষ্টা যেমন মানুষের পূর্ণ অতীত জানেন, তেমনি জানেন তার ভবিষ্যৎ। তাই তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয় একটি ক্রটিহীন ও শাশ্বত জীবনবিধান রচনা করা। তাই তাঁর হুকুম যদি মানবজাতি মেনে নেয় তাহলেই তারা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হতে পারবে এবং পৃথিবীর বুকে স্বর্গের শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

শোনা কথায় বিশ্বাস মুসলমানের কাজ নয়

আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বলেছেন, “যদি আসমান ও জমিনের মাঝে তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ থাকতো তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত (সুরা আম্বিয়া ২২)।” কোর’আনে এরকম বহু আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাঁর একত্বের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে মানুষকে ঈমান আনতে আহ্বান করেছেন। না বুঝে ঈমান আনতে তিনি কখনও বলেন নি। বহু জায়গায় চিন্তা করার জন্য বলেছেন, “তোমরা কি চিন্তা করবে না?” (সুরা নাহল ১৫-১৭) অতএব মুসলমান জাতিকেও এখন যুক্তিশীল, চিন্তাশীল হতে হবে।

জনগণকে এখন নিজের মগজ খাটাতে হবে, অন্যের মগজ ব্যবহার করলে চলবে না। মুসলমান জাতি কখনই গুজব নির্ভর ছিল না। আল্লাহর রাসুল কখনই গুজব বা হুজুগকে প্রাধান্য দেন নি। ইতিহাসের ছোট্ট একটি ঘটনার মাধ্যমে তা বোঝা যায়, “আল্লাহর রাসুলের ছেলে ইব্রাহিম যেদিন ইন্তেকাল করলেন সেদিন সূর্য গ্রহণ হলো। লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, তিনি মনে হয় সত্য নবী, কারণ তাঁর ছেলে মৃত্যু বরণ করেছে বলেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। চলো সবাই তাঁর কাছে ঈমান আনি।” রাসুলাল্লাহ এসব আলোচনা শুনে ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন এবং বললেন, “আমি শুনতে পেলাম তোমরা বলাবলি করছো আমার ছেলে ইন্তেকাল করেছে বলে সূর্য গ্রহণ হয়েছে। এটা ভুল! আমার ছেলের হায়াত শেষ তাই সে ইন্তেকাল করেছে। এর সাথে সূর্যগ্রহণের কোন সম্পর্ক নেই। সূর্যগ্রহণ প্রাকৃতিক নিয়মের অংশ।” ইচ্ছা করলে তিনি চুপও থাকতে পারতেন। কারণ এতে করে অনেক লোক তাঁর উপর ঈমান আনতো। কিন্তু তিনি তা করলেন না, তিনি সকল গুজব, হুজুগের ডালপালাকে কেটে শিকড়সহ উপড়ে ফেলে দিলেন।

কিন্তু আজ তাঁর অনুসারী দাবিদার জনগোষ্ঠীটি অনেকটাই গুজব নির্ভর হয়ে পড়েছে। তারা চিন্তাভাবনা ছাড়াই ফেসবুকের মত অনির্ভরযোগ্য মাধ্যমের প্রচারণাকেই বিশ্বাস করে। এখানে প্রচুর ফেইক আইডি আছে যার মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলক প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। অথচ আমরা দেখি ফেসবুকে প্রচারিত একটি বানোয়াট ছবিকে ভিত্তি করে হাজার হাজার মুসল্লি ফেতনাবাজ আলেম মওলানাদের প্ররোচনায় কোনো একটি সম্প্রদায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, মানুষ হত্যা করছে, কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস করে দিচ্ছে, অন্য ধর্মের উপাসনালয় গুড়িয়ে দিচ্ছে। এতে কি ইসলামের উপকার হচ্ছে? না! বরং ক্ষতি হচ্ছে। প্রকৃত মুসলমান কখনই হুজুগ আর গুজবের উপর ভিত্তি করে কাজ করে না। তারা কাজ করে সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিতভাবে। তারা জেনে বুঝে কাজ করে। কোর’আন, হাদিসে কী নির্দেশ দেয়া আছে, তাদের এমাম কী নির্দেশ দিয়েছেন সেই মোতাবেক কাজ করে। কিন্তু এটা কিভাবে হলো যে একটা ইস্যু তৈরি করে দেওয়া হলো, আর লক্ষ লক্ষ মুসলমান হৈ হৈ রৈ রৈ করে সেদিকে ছুটতে লাগল? যখন কোন ইস্যু সৃষ্টি হয় তখন সরকারের ঘুম হারাম হয়ে যায়। বায়তুল মোকাররমের সামনে হাজার হাজার পুলিশ, র‌্যাব রাইফেল হাতে পাহারা দেয় কারণ নামাজের পর বিক্ষোভ হবে। যে নামাজ মানুষকে ঐক্যের শিক্ষা দেয়, ইমামের তাকবীরের সাথে সাথে আনুগত্য করতে শেখায় সে নামাজ শেষ করে মানুষগুলো অনৈক্য সৃষ্টির জন্য উন্মাদের মতো কোনো রকম চিন্তাভাবনা ব্যতীত অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেন মুসলিম জাতি এমন হয়ে গেল?

মুসলিমদের এখন সুপরিকল্পিতভাবে, সুচিন্তিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই ইসলামের উপকার হবে। এখন তাদের কাজের ফলে ইসলামের বদনাম হচ্ছে। এই সাধারণ জ্ঞান বিবর্জিত আচরণ পরিহার করলে মানুষ আবার এই দীনের সৌন্দর্য দেখে আকৃষ্ট হবে। মুসলমানদের মনে রাখতে হবে, চিন্তাভাবনাহীন প্রতিটা কাজের জন্য, প্রতিটা কথার জন্য হাশরের দিন আমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭

দীন নিয়ে বাড়াবড়ি নিষিদ্ধ


আল্লাহ তাঁর রসুলের মাধ্যমে যে শেষ দীন প্রেরণ করেছেন সেই দীন সহজ ও সরল। এই দীনে কোন জটিলতা নেই। আল্লাহর রসুল তাঁর বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলাল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই দীন সহজ-সরল। দীন নিয়ে যে কড়াকড়ি করে দীন তার বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং দীনের নিকটবর্তী থাক, নিয়মিত পূণ্যের কাজে পুরস্কারের সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং সকাল- সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদতের মাধ্যমে) আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর।” 
.
এছাড়াও দীন শিক্ষা দেয়ার সময় রসুল দীনকে সহজভাবে তুলে ধরার কথাও বলেছেন। রসুলাল্লাহ মুয়াজ ও আবু মুসা (রা.)-কে ইয়ামেনে প্রেরণের প্রাক্কালে এ উপদেশ দিয়েছিলেন যে, “(জনগণের কাছে ধর্মীয় বিষয়গুলো) সহজ করে তুলে ধরো, কঠিনরূপে নয়। একে অপরকে মান্য কর, বিভেদে লিপ্ত হয়ো না।” রসুলাল্লাহর আরেকটি হাদিস আবু ইয়ালা তার মুসনাদে আনাস ইবনে মালিকের বরাতে এবং ইবনে কাছীর সুরা হাদীদের ২৭ আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন। সেই হাদিসে রয়েছে, রসুল বলতেন, “নিজের উপর এমন অতিরিক্ত বোঝা চাপিও না যাতে তোমার ধ্বংস হওয়ার আশংকা থাকে। তোমাদের পূর্ববর্তী জনগোষ্ঠী নিজেদের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে ধ্বংস হয়েছে। তাদের ধ্বংসাবশেষ পুরাতন মঠ-মন্দিরে খুঁজে পাওয়া যায়।”
.
এই হাদিসগুলো থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে দীন নিয়ে কোন বাড়াবাড়ি ইসলামে নেই। যে জাতিই দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে সে জাতিই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আমরা মুসলিমরা দীনের অনেক বিষয় নিয়ে এখনও বাড়াবাড়ি করেই চলেছি। এই বাড়াবাড়ি শুধু এখন নয়, এই বাড়াবাড়ি বহুপূর্ব থেকেই চলে আসছে। রসুলের ওফাতের ৬০-৭০ বছর পর যখন জাতির আকিদায় ফাটল ধরলো তখন থেকেই জাতির মধ্যকার আলেমরা দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেছিলেন। সেই দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত রূপ আজ সমাজে বিদ্যমান।
.
উদাহারণস্বরূপ যদি আমি বলি আমাদের সমাজে মেয়েদের পর্দা করা নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আজও রয়েছে। পর্দা বলতে এখনও মনে করা হয় পা থেকে মাথা পর্যন্ত বোরকা দিয়ে ঢেকে রাখা। অনেকে নারীকে ঘরের বাইরে যেতে দিতেই নারাজ। কিন্তু ইসলামের নীতি কি সত্যিই এমন?
পবিত্র কোর’আনের সুরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে ও তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণভাবে প্রকাশমান তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের চাদর/ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে।” এছাড়াও কোর’আনের সুরা আহযাবের ৫৯ আয়াতে বলা হয়েছে, “হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”
.
এই দুটি আয়াতের মধ্যে যদি আমরা লক্ষ করি তাহলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাবো যে আল্লাহ একটি সহজ নীতি দিয়ে দিয়েছেন। তিনি এখানে স্বাভাবিক কাজকর্ম করার জন্য প্রকাশমান অঙ্গগুলি খোলা রাখতে অনুমতি দিয়েছেন আবার চাদরের কিছু অংশ দিয়ে বক্ষদেশ আবৃত রাখতে বলেছেন যাতে তাদের মুখ ঢেকে গিয়ে তাদের চিনতে ব্যাঘাত না ঘটে। কিন্তু এই দুটি সহজ আয়াত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়। আজ নারীরা তাদের অধিকার পাবার জন্য পশ্চিমা অশ্লীল সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে কারণ তারা আল্লাহর এত সুন্দর বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ। আমাদের আলেম সমাজের অতি বিশ্লেষণ ও দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির ফলে তাদের অনেকেই ইসলামকে দুর্বহ বোঝা মনে করেন। ইসলামবিদ্বেষী হয়ে যান। এমতাবস্থায় আমরা হেযবুত তওহীদ চেষ্টা করছি আল্লাহর দেওয়া সহজ-সরল নীতিগুলোকে পুনরায় উদ্ভাসিত করতে।
.
এরকম আরও বহু বিষয় রয়েছে যেগুলোর ব্যাপারে আমরা এখনও বাড়াবাড়ি করি। আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ তাঁর দীনকে প্রেরণ করেছেন মানবজাতির কল্যাণ ও মুক্তির জন্য। সেই হেদায়াহ বা সত্যদীন এসেছে মানবজীবনের সকল জটিলতা ও সংকীর্ণতা দুর করার জন্য। কিন্তু আমাদের মধ্যকার এক শ্রেণীর আলেম এখনও এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে নি। তারা এখনও দীন নিয়ে বাড়াবড়ি করে যাচ্ছে এবং এর ফলে দীন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে। আমরা হেযবুত তওহীদ এই বিষয়টি নিয়ে বরাবরই কথা বলে চলেছি। দীন নিয়ে যা বাড়াবাড়ি হয়েছে সেগুলোকে দূর করে এখন আল্লাহ প্রদত্ত প্রকৃত দীনকে ধারণ করতে হবে। আল্লাহ দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি নিষেধ করা সত্ত্বেও যদি আমরা সেটা করি সেটা হবে আল্লাহর হুকুম না মানা যা জাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
.
‘দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ’ এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) এর জীবনের একটি উত্তম ঘটনা তুলে ধরছি। “তিনি একদিন কুফার একটি উন্মুক্ত স্থানে যোহরের সালাহ আদায় করলেন এবং মানুষের অভাব অভিযোগ শোনার জন্য বসলেন। এভাবে আসরের সালাহর সময় হয়ে গেল। তারপর তার কাছে পানি আনা হলে তিনি পানি পান করলের, মুখ-হাত-মাথা ইত্যাদি ধৌত করলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন এবং দাঁড়িয়ে অবশিষ্ট পানি পান করলেন। এরপর দাঁড়িয়ে বললেন- মানুষ দাঁড়িয়ে পানি পান করা পছন্দ করেন না কিন্তু আমি যা করলাম রসুল (স.) তাই করেছেন (সহী বুখারী, কিতাবুল আশরিক, দশম খ-, পৃষ্ঠা-১৮৩)

মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

শেষ ভালো যার সব ভালো তার



সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, “রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।” নিঃসন্দেহে সত্য বলেছেন কিন্তু কথা হচ্ছে ভাবমূর্তির এই উজ্জ্বলতা কতটা টেকসই হবে সেটা নির্ভর করে আমাদের পরবর্তী কার্যক্রমের উপর। রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের জন্য কেবল ভাবমূর্তিই নিয়ে আসে নি বরং তাদের উপর চলা দুঃসহ নির্যাতন দেখে আমাদেরও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ও সতর্ক হওয়া উচিত, কারাণ তাদের এই অবস্থার মূল কারণ তাদের মুসলিম পরিচয় যা কিনা আমরাও ধারণ করি।

মায়ানামারের সেনাবাহিনী কর্তৃক নিপীড়ন, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তারা আমাদের দেশে এসেছেন। তাদের দুর্দশার খবর আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিছুদিন আগেও তাদের সব ছিল, জমিজমা, বাড়ি গাড়ি, চাকরি, ব্যবসা অর্থাৎ পার্থিব যা কিছু মানুষের থাকে। আজ তাদের কিছুই নেই, সম্মান নেই, সম্পদ নেই। কেবল দু মুঠো ত্রাণের জন্য তাদেরকে সকাল সন্ধ্যা দৌঁড় ঝাপ করতে হচ্ছে। তাদের একটাই পরিচয়- তারা সবাই উদ্বাস্তু। নিয়তি তাদের সবার অবস্থা এক করে দিয়েছে।

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরে আমরা দেখেছি কীভাবে একজন রোহিঙ্গা চেয়ারম্যান ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে অঝোরে অশ্রুবিসর্জন করছিলেন। তিনি বললেন, এক সপ্তাহ আগে তিনিও তার এলাকায় দুঃস্থদেরকে ত্রাণ বিতরণ করেছেন, অথচ এক সপ্তাহ পরে তিনি নিজেই ত্রাণের জন্য হাত পেতে আছেন। এর অর্থ যদি আমরা বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করি দেখব ইরাক যখন মার্কিন বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন সিরিয়াতে আশ্রয় নেওয়া ইরাকীদেরকে সিরিয়া ত্রাণ দিয়ে সহায়তা করেছে। এখন সিরিয়ার নাগরিকরাও উদ্বাস্তু, তারাও কোনো না কোনো ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় খুঁজে ফিরছে। আজ বাংলাদেশ ত্রাণ বিতরণ করছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছে বলে আত্মভরিতায় স্ফীত হওয়ার কোনো মানে নেই। যুদ্ধ সংক্রামক যা প্রতিবেশী দেশকে আক্রান্ত করে, আর সংকটটা মুসলিম জাতি কেন্দ্রিক। কোনোভাবে শুধু জঙ্গিবাদ ইস্যুটাকে বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপাতে পারলেই কেল্লা ফতেহ হয়ে যাবে অস্ত্রব্যবসায়ী কথিত উন্নত, সভ্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর। তারা কেবল একমনে দেখে যাচ্ছে কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। বিশ্ব রাজনীতিতে বিবৃতির তুফান উঠেছে কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ কেউই নিচ্ছে না।

বহু সামরিক বিশেষজ্ঞ বলে দিয়েছেন বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুর দরুন নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে, তাদের সামরিক কপ্টার, ড্রোন ইত্যাদি উনিশবার বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করেছে, তাদের ধর্মনেতারা ফেনী পর্যন্ত আরাকানের অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। তাদেরকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া-চীন-ভারতের মত পরাশক্তি। ভারত অস্ত্রও বিক্রি করতে চাচ্ছে মায়ানমারের কাছে, ইসরাইল তো বিক্রি করছেই। সুতরাং বলা যায় না ঘটনা কোনদিকে মোড় নেয়। যে কোনো মুহূর্তে এ সংকট বাংলাদেশের দিকেও ধেয়ে আসতে পারে, আমাদের প্রিয় জন্মভূমিও মগ দস্যুদের দ্বারা আবারও আক্রান্ত হতে পারে। সু-শাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য বিরাট সংকট।’ এমনটা আরো অনেকেই বলেছেন।

কথা হচ্ছে, যুদ্ধের ইস্যু পাওয়া না গেলেও যুদ্ধ নির্মাণ করার যথেষ্ট কলাকৌশল পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর জানা আছে। ইরাকে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই তবু সেই মিথ্যা অজুহাতে তারা ইরাকে আক্রমণ করে দশ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে। টুইন টাওয়ার হামলার নেপথ্যে কারা ছিল সেটা ভালোভাবে তদন্ত হতে না হতেই তারা আফগানিস্তানে আক্রমণ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছিল। তারা অজুহাত একটা পেয়ে যাবেই, উপরন্তু যখন জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো একের পর এক হঠকারী ঘোষণা দিয়েই যাচ্ছে যে তারা নাকি মায়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তখন স্বতঃস্ফূর্ত ইস্যু তো হাতের নাগালেই রয়েছে। ভারতের পেটের মধ্যে বাংলাদেশ একটি ভূখ- যার ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন তাই মায়ানমারকে সমর্থন দিয়ে এ অঞ্চলে তাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না বটে, কিন্তু আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ ইস্যু এখানে দৃশ্যমান হলে তারাও বসে থাকবে না। অস্ত্রব্যবসায় নেমে পড়বে। সবদিক বিবেচনা করলে এই দাঁড়ায় যে আমাদের পক্ষে কোন পরাশক্তি নেই।

এদিকে আমাদের দেশের মধ্যেও বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা ধর্মান্ধ ও হুজুগপ্রবণ। কোনো একটা ইস্যু পেলেই তারা মাথা গরম করে হুঙ্কার দিতে থাকে, লক্ষ লক্ষ লোক জমায়েত করে সংখ্যার গরিমা প্রদর্শন করতে থাকে। তাদের সামরিক চরিত্র নেই, আছে দাঙ্গাপ্রবণতা। এটা আমাদের দেশে যেমন আছে পাকিস্তানেও আছে। এরা অকারণেই হৈ চৈ করে জল ঘোলা করে ফেলে, বিশৃঙ্খলা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারে না। একটা গরম বক্তৃতা দিয়ে তাদের নেতারা যার যার ধর্মব্যবসার কেন্দ্রে গিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন এই ভেবে যে ইসলামের জন্য বড় কিছু করে ফেললাম। মানুষও তাদেরকে ইসলামের পক্ষের লোক ভেবে সাহস পায়। কিন্তু এই আবেগসর্বস্ব আন্দোলন বা রাজনৈতিক দলগুলো বাস্তব সংকটের সামনে বড়ই অসহায়। কেননা দাঙ্গা দিয়ে কোনোদিন যুদ্ধ মোকাবেলা করা যায় নি, কোনোদিন যাবেও না। এদের লম্ফঝম্ফ দেখে বরং বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশকে একটি জঙ্গিবাদী, উগ্রবাদী দেশ বলে চিনে নিতে পারবে।

এসব কিছুর সম্মিলনেই ইরাকে, সিরিয়ায় যেমন হয়েছে আমাদের দেশেও রণাঙ্গণ প্রস্তুত করা হতে পারে। জঙ্গিাবাদের ভুল আদর্শ একবার ছড়িয়ে পড়লে তা থাকুক বা না থাকুক পশ্চিমা পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পরাশক্তিরা উভয়ে মিলে বাংলাদেশকে ইরাক সিরিয়ার মতো পরিণত করবেই। তখন বাংলাদেশের অবস্থা কীরূপ হবে তা বুঝাই যায়।
অতএব মন্ত্রীমহোদয়ের কথা অনুসারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জল হলেও তা দেশকে সংকট থেকে মুক্ত করতে পারছে না। সুতরাং আমাদের আত্মপ্রসাদ উপভোগের সময় এখনও আসে নি, এখনই বলা যায় না দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে নাকি দেশ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী, অস্ত্রব্যবসায়ী ও ধর্মব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র আরো গাঢ় হয়েছে। বরং দেশকে যদি অস্থিতিশীল হওয়া থেকে বিরত রেখে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা যায় এবং এই সমস্যার সঠিক সমাধান করা যায় তখন এই কথা বলা সময়োপযোগী হবে। “শেষ ভালো যার সব ভালো তার”- কথাটি ভুললে চলবে না। এখনও বাংলাদেশ প্রবল হুমকির মুখেই রয়েছে, এখন সেটা থেকে মুক্তির পথ সন্ধান করতে হবে, দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে হবে।

সময় কাটে

সময় কাটে  ঘড়ির কাটার সাথে, যখন হয়না কথা জমে নীরবতা।  দূর বহুদূরের পথ,  তোমার আমার হোক শপথ, একসাথে খুঁজব সব গলি। আকাশের কোটি তারা, নিজ পথে...