সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

যুগের তালে

আমায় একটু লুক দিও
ফেসবুকে তে পোক দিও
আমি কী আর চাইকো বেশি
একটুখানি ভাও তো দিও।

ফাল্গুনে তে ঘুরতে নিও
চেক ইন আর সেল্ফি দিও
ভুল যদি হয় একটুখানি
মেসেজ করে ধমকে দিও।

রেস্তোরাতে ঘুরতে নিয়ে
আমার দিকে নজর দিও
খাওয়ার ফাঁকে সুরসুরিটা
একটু না হয় আস্তে দিও।

ভালোবাসা সর্বনাশা
গেট টুগেদার মূল ভরসা
ফ্রেন্ড হয়ে সব লুটিয়ে দিও
বেনিফিটে ভরিয়ে দিও।

যুগের তালে সব ভেসেছে
নিজেকেও ভাসিয়ে দিও
মাস্তি করে পাত্তি মেরে
আত্মা বেচে নরক নিও।

সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

ব্যবস্থা ও চেতনায় যখন ধর্ম যুক্ত হয়

যদি দুনিয়ার সকল সম্পদকে শ্রেণীবিভাগ করতে চাই তাহলে দেখা যাবে যে দুনিয়ার সকল সম্পদ মূলত দুইভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে কাঁচামাল ও অপরটি হচ্ছে শ্রম। আল্লাহ দুনিয়ায় পর্যাপ্ত রকমের কাঁচামাল প্রদান করেছেন এবং সেই কাঁচামালকে যাতে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করতে পারে সে জন্য মানুষকে দিয়েছেন শ্রম করার সামর্থ্য ও মেধা। ধরুন আপনি একটি জাহাজ তৈরি করতে চান। জাহাজ তৈরির কাঁচামাল লোহা আপনি পাচ্ছেন প্রকৃতি থেকে যা আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন। এবার এই লোহাকে আপনি নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে জাহাজ তৈরি করবেন। অতএব উন্নয়নের জন্য মূল দুটি উপাদানই হলো কাঁচামাল ও শ্রম।
প্রচলিত যে সিস্টেমগুলো রয়েছে তাতে এই কাঁচামাল ও শ্রমকেই ব্যবহার করে উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছে কিন্তু এর ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে শোষণ ও বিশৃঙ্খলা। যদি আমি গণতন্ত্রের দিকে তাকাই তবে দেখবো যে ব্যক্তি মালিকানার ফলে কাঁচামাল একজনের কাছে কুক্ষিগত হচ্ছে এবং তারাই প্রতিটি উন্নয়নের থেকে লাভবান হচ্ছে। যদিও যারা শ্রম ও মেধা দেয় তাদের এজন্য মজুরী দেয়া হয় কিন্তু সে মজুরী তাদের শ্রমের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। এর ফলেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব হয় যেখনে কাঁচামালকে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে কাঁচামাল যেমন রাষ্ট্র সরবরাহ করে তেমনি শ্রমকেও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সেখানেও এক প্রকার শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা যাওয়ার ফলে তারা এক পর্যায়ে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে এবং আবারও সেই বৈষম্য দেখা দেয়। তো দেখা যাচ্ছে যে উভয় তন্ত্রেই শেষমেষ বৈষম্যের স্বীকার হতে হচ্ছে।
মূলত তাত্ত্বিকভবে দেখতে গেলে সকল তন্ত্রই সঠিক কিন্তু প্রায়োগিক দিকে গিয়ে প্রতিটি তন্ত্রই তাদের আবেদন ধরে রাখতে সক্ষম হয় নি। এই আবেদন হারিয়ে ফেলার কারণ হচ্ছে যিনি কাঁচামালের দায়িত্বে থাকেন ও শ্রমকে পরিচালনা করেন তিনি নৈতিকভাবে শক্তিশালী হন না। এর কারণ হচ্ছে দায়িত্বে থাকার ফলে তিনি ক্ষমতা ও সম্পদের সংস্পর্শে আসেন ও এর ফলে তার মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়। এখন যদি তার মধ্যে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা থাকে তবে তিনি এই অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন। কারণ ধর্মের মাধ্যমে তার মধ্যে স্রষ্টার প্রতি ভয়ের সৃষ্টি হয়, নিজের বিবেকের প্রতি সদাচারণ করার শিক্ষা তিনি লাভ করেন। ধর্ম থেকে তিনি নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা পান। তার মধ্যকার স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা দূরীভূত হয় ও এর ফলে সে প্রতিটি কাজ করে দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণের জন্য।
সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ফলে যে সাম্য, শোষণহীন সমাজ, বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিমালিকানা ইত্যাদি সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয় মূলত তা তাত্ত্বিকভাবেই শতভাগ মানা হয়, প্রায়োগিক দিক থেকে যদি বিবেচনা করি তবে ফলাফল শূন্যের ঘরে দেখা যাবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে অর্ধপৃথিবীতে এমন একটি ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে ব্যবস্থার ফলে ব্যক্তির ভিতরে নীতি-নৈতিকতার প্রসার হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে সেই ধার্মিক যে কোনো কাজের আগে ন্যায় অন্যায় নিয়ে ভাবছে। সে প্রতিটি কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহীতার ভয় পাচ্ছে।
সমাজতন্ত্র যে সাম্য দিতে পারে নি প্রকৃত ইসলামের মাধ্যমে তা সহজেই লাভ হবে, গণতন্ত্র যে বাক-স্বাধীনতা দিতে পারে নি তাও ইসলাম দিবে যা ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। অতএব প্রকৃতভাবে যদি উন্নয়ন করতে হয় তবে প্রকৃত ধর্ম অত্যাবশ্যক। ধর্মকে বাদ দিয়ে আপনি যে জীবনব্যবস্থাই নিন না কেন তা আপনার কাছে তাত্ত্বিক দিক দিয়েই ভালো লাগবে, প্রায়োগিক দিক দিয়ে তা আপনাকে কখনই প্রশান্তি দিতে সক্ষম হবে না। তবে বলে রাখা ভালো, বর্তমানে ইসলাম বলে যেটা পৃথিবীতে প্রচলিত আছে সেটা আল্লাহ রসুলের প্রকৃত ইসলাম নয়, বরং প্রকৃত ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের যদি শান্তি পেতে হয় তাহলে প্রকৃত ইসলামের রূপরেখাটি জেনে সেটা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কারণ তাত্ত্বিকভাবে নয় শুধু প্রকৃত ইসলাম বাস্তবেই অর্ধপৃথিবীতে শান্তি দেওয়ার ইতিহাস রচনা করেছিল।
প্রকাশ- দৈনিক বজ্রশক্তি, (১২.০২.২০১৮)

শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

ইসলামের অন্যতম বিকৃতি, আরবীয় সংস্কৃতিকে ইসলাম মনে করা

বর্তমানে পৃথিবীতে যতগুলি ধর্ম প্রচলিত রয়েছে তাদের প্রতিটির মধ্যে সময়ের বিবর্তনে আর ইবলিসের প্ররোচনায় বিকৃতি এসেছে। ইসলামের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি। এর ফলে এক কালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম জাতি আর ইসলামের অনুসারী হয়েও নিকৃষ্টতম জাতিতে পরিণত হয়েছে। ইসলামের এইসব বিকৃতির হাত থেকে জাতিকে উদ্ধার করার জন্য আলেমদের বড় ভূমিকা থাকবে এমনটাই আশা করা স্বাভাবিক। কিন্তু বেশ কিছু বিষয় এ ক্ষেত্রে তাদের সামনে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের আলেম সাহেবদের বড় ব্যর্থতা হলো ইসলামকে বর্তমান যুগের উপযোগী হিসাবে উপস্থাপন করতে না পারা। তারা হাজার বছর আগের রচনা করা মাসলা মাসায়েল আর ফতোয়াগুলোকে দিয়ে আধুনিক দুনিয়া চালাতে চান। ইসলাম কে তারা সর্বাধুনিক বলেন মুখে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্রভেদে এর পরিবর্তনশীলতাকে অস্বীকার করেন এবং ক্ষিপ্ত হয়ে যান। ইসলামের প্রসঙ্গ উঠলেই তারা প্রাচীন ফিকাহ আর ফতোয়ার কেতাব নিয়ে বসেন। পাঁচশ বছর আগের খোতবা এখনো মসজিদে পড়ে শোনান। এসব ফতোয়ার বিপরীতে যুক্তি, বিবেকের দাবি দূরে থাক কোর’আনকে মানতেও অনেকে নারাজ। আকাশের যত তারা ফতোয়ার তত ধারা। সুতরাং ইসলাম তাদের কুক্ষিগত থাকতে বাধ্য, জনগণ কোনোদিন ইসলাম বুঝতে সক্ষম হোক এটা তারা হতে দেবেন না।
আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে রসুলাল্লাহর (সা.) উপর যে কেতাব নাজিল হয়েছিল সেই কেতাব কোর’আন হচ্ছে এমন কিছু মূলনীতির সংকলন যেগুলো শ্বাশ্বত ও চিরন্তন প্রাকৃতিক নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন কোর’আনে ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে। ঐক্য মানেই শক্তি, এ কথাটি লক্ষ বছর আগেও সত্য ছিল, এখনও সত্য। কোর’আনে দীনের মূলনীতিগুলো এমন যেগুলো কেয়ামত পর্যন্তই অপরিবর্তনীয়। পরিবর্তন করলে বিপর্যয় ঘটতে বাধ্য। কিন্তু রসুলাল্লাহ (সা.) সে সময়ের আরবদের জন্য উপযোগী করে, তাদের জীবনের সাথে মিলিয়ে ইসলাম শিক্ষা দিয়েছেন। আরবীয়রা আগে থেকে যে পোশাক পরত রসুল তাদেরকে ভিন্ন কোনো পোশাক পরিধানের নির্দেশ দেন নি। আবার অনারব কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তাকেও আরবীয় পোশাক পরতে বাধ্য করেন নি। কেননা ইসলামে পুরুষের পোশাকের নীতিমালা হচ্ছে সতর ঢাকা আর সেটা হচ্ছে নাভি থেকে হাঁটু অবধি। আপনি যে কোনো পোশাক দিয়ে যদি এটুকু আবৃত রাখেন ইসলাম তাতে কোনো বিধিনিষেধ দেয় না। রসুল নিজেও আরবের পোশাক ও খাদ্যে অভ্যস্ত ছিলেন। এ কথাগুলোই হাদিসে এসেছে।
এখন সমস্যা হচ্ছে আমাদের আলেম সাহেবরা সেই আরবীয় প্রেক্ষাপটকেই ইসলাম বানিয়ে নিয়েছেন। তাদের কাছে আরবী ইসলামের ভাষা, খেজুর খাওয়া সুন্নত, দাড়ি রাখা, আরবীয় পোশাক, চেক রুমাল, পাগড়ি পরা সুন্নত। তারা এটা বুঝতে নারাজ যে, আল্লাহর রসুল অন্য দেশে আসলে তিনি সে দেশের ভাষায়ই কথা বলতেন, সে দেশের খাদ্যই খেতেন। তারা সেই আরবীয় সংস্কৃতিগুলোকে ইসলাম মনে করে সেগুলোকে মুসলিমদের উপর চাপানোর জন্য মরিয়া। কেউ উত্তম মুসলিম হতে গেলে প্রথমেই তাকে দাড়ি, টুপি, লেবাস ইত্যাদির শর্ত পূরণ করতে হবে। শার্ট প্যান্ট টি শার্ট জিন্স তাই কোনো ক্রমেই ইসলামিক নয়। ১৪০০ বছরে মানুষের রুচি অভিরুচিতে বিবর্তন সাধিত হবে এটা খুব স্বাভাবিক ও সময়ের বৈশিষ্ট্য। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করে কোনো জীবনব্যবস্থাই টিকে থাকতে পারে না। এই দীর্ঘ সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে যার মূলে মুসলিম বিজ্ঞানীদেরও অনেক অবদান ছিল। এই যে বিবর্তিত সময় উপস্থিত হয়েছে এই গতিশীল যুগেও যুক্তি ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক ইত্যাদি যাবতীয় সমস্যার সমাধান যে ইসলাম করতে পারে, ইসলাম সারা দুনিয়াকে আরব বানাতে চায় না এইভাবে ইসলামটাকে উপস্থাপন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। তারা এখনও সেই পুরনো যুগে যে সমাধানগুলো দিয়ে এ যুগের সমস্যাকে মোকাবেলা করতে উৎসুক। এক হাজার বছর আগের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে সমস্যার যে সমাধান ইমাম গাজ্জালী বা ইমাম আবু হানিফারা দিয়ে গেছেন সেই ওখান থেকে সরে আসাকে তারা ইসলাম ত্যাগ করার মতো গর্হিত অপরাধ জ্ঞান করেন। তারা এটা বুঝতে অক্ষম যে, আল্লাহর রসুলের হাতে গড়া উম্মতে মোহাম্মদীর পরবর্তী যুগের ফেরকা মাজহাবের আলেম ওলামাদের অতিবিশ্লেষণের ফসল হিসাবে যে জটিল, দুর্বোধ্য ইসলামটি দাঁড়িয়ে গেছে সেটা সেই যুগে হয়তো জোর করে চালানো গেছে, কিন্তু এই যুগে তা বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে বাধ্য।
যুগের সাথে খাপ খাচ্ছে না বলে মানুষ তা গণহারে প্রত্যাখ্যান করছে তাই প্রয়োজন হয়ে পড়ছে জোর করার – অথচ দীনের মূল নীতির একটি হচ্ছে – দীনের মধ্যে কোনো জবরদস্তি নেই। তারা বলছেন নারীদের ঘরে থাকতে হবে, নারী নেতৃত্ব হারাম, ছেলেদের দাড়ি রাখতে হবে, আরবীয় লেবাস পরতে হবে, নাচ-গান-ছবি আঁকা, ভাস্কর্য তৈরি সব হারাম। কোর’আন এগুলোর একটাকেও প্রত্যক্ষভাবে হারাম করে নি, কিন্তু ফতোয়া দিয়ে সবই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমন বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে।
তাদের হাতে থাকা কেতাবি ইসলামটা কতটুকু অন্ধ, তার গতিপ্রকৃতি কী – তার বাস্তব নিদর্শন কথিত জঙ্গিবাদীদের কার্যকলাপ, যা ইসলামভীতির সৃষ্টি করেছে। প্রকৃত ইসলাম তো অন্য জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা এমন ঘৃণিত হয় নি? প্রকৃত ইসলাম যে এমন ছিল না, এ সরল কথাটি বোঝার জন্য যে মানবিক হৃদয় লাগে সেটার কবর তারা বহু বছর আগেই রচনা করেছেন। তাদের হৃদয়ে মোহর, চোখে পর্দা, কানে তালা।
বর্তমানে ইসলামের মধ্যে যে বহুবিধ বিকৃতি প্রবেশ করেছে আরবীয় সংস্কৃতিকে ইসলামের সাথে গুলিয়ে ফেলা তার একটি। ইসলামের যা কিছু মৌলিক নীতি তা কোর’আনে আছে, সেগুলো কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু যে বিষয়গুলো একান্তই পারিপার্শ্বিকতার উপর নির্ভর করে সে বিষয়গুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকাটা এক প্রকার অন্ধত্ব- এটা বুঝে ইসলামের মূলনীতিগুলোর অগ্রাধিকার দিতে হবে। যারা ইসলামকে আবারো এই যুগে জীবনব্যবস্থা হিসাবে দেখতে চান, যারা ইসলামের বিশেষজ্ঞ তাদের এটুকু বিবেচনা করতে হবে যে, ইসলাম সারা পৃথিবীকে আরব দেশ বানাতে আসে নি, মরুভূমির বিধান নদীমাতৃক বা বনাঞ্চলে চলবে না। ইসলাম এসেছে সর্বযুগের জন্য, সব পরিবেশের জন্য। এটা যদি আমরা না বুঝি, আকাশের মতো উদার ইসলামকে স্থান কাল পাত্রের ক্ষুদ্রতায় বন্দী করে রাখি তাহলে আমাদের এই কূপমণ্ডুক চিন্তাধারার দায় আল্লাহ-রসুলের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং এতে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা আরো বিনষ্ট হবে, ইসলামের আরো বদনাম হবে।
(লেখক: সহকারী সহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি)

মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

ধর্মব্যবসার অবসান অত্যাবশ্যক

পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেন, “যারা কিতাবের অংশ গোপন করে ও কিতাবের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ঢুকায় না (সুরা বাকারা ১৭৪)।” বর্তমানে মুসলিম হিসেবে পরিচিত জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ আল্লাহর এই নিষেধকে অমান্য করছে। কেউ ধর্মব্যবসা করে খাচ্ছে, কেউ ধর্মব্যবসায়ীদের দিচ্ছেন, কেউ বা মৌন থেকে একে সম্মতি দিচ্ছেন। কিন্তু আল্লাহ কোর’আনে স্পষ্ট যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছেন তা মেনে নেয়া আমাদের অবশ্য কর্তব্য। এখন কথা হচ্ছে তাহলে এই ধর্মব্যবসা নামক রোগ থেকে জাতিকে উদ্ধারের উপায় কী?
.
বহু বছরের চর্চার ফলে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা যখন সমাজে প্রচলিত হয়ে পড়ে তখন হুট করে তাকে বদলে দেয়া যায় না। এর সাথে সমাজের বহু প্রতিষ্ঠানের, বহু মানুষের জীবন ও কর্মসংস্থান জড়িয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টি যখন জাতি বিনাশী পর্যায়ে চলে যায় তখন তাকে আর ফেলে রাখা যায় না। যত মানুষই জড়িত থাকুক না কেন সে বিষয়ে একটি নিষ্পত্তি অত্যাবশ্যক। এই নিষ্পত্তির জন্য আমাদের সকলকে সমন্বিত উদ্যেগ নিতে হবে। সমাজ থেকে ধর্মব্যবসার বিষবৃক্ষকে সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। নয়তো এই বিষবৃক্ষের শিকর সমগ্র সমাজকে গ্রাস করে সমাজকে ধ্বংস করে ফেলবে।
.
এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সর্বপ্রথম আমাদের করণীয় হল ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে পৌঁছে দেয়া। ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করা। ধর্মব্যবসা যেহেতু ধর্মকে কেন্দ্র করে করা হয় সেহেতু ধর্মের থেকে উপযুক্ত যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ধর্মব্যবসাকে দূরীভূত করতে হবে। জনসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। ধর্মব্যবসা টিকে থাকার সবচেয়ে বড় কারণই হচ্ছে যুগে যুগে ধর্মব্যবসায়ীরা আল্লাহর ও তাঁর রসুলের এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞাগুলোকে গোপন করে গেছে। প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা যখন জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে তখন জনগণ এ বিষয়ে সচেতন হবে। এর ফলে তারা যদি ধর্মব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়েও তখন তারা নিজেরাই তাদের শুধরে দিতে পারবে ও নিজেদেরকেও এই ন্যাক্কারজনক কাজ থেকে দুরে রাখতে সক্ষম হবে।
.
মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই যুক্তিকে অধিক প্রাধান্য দেয়। তাই উপযুক্ত যুক্তি প্রমাণ ও দলিলের মাধ্যমে যদি জনসচেতনা সৃষ্টি সম্ভব হয় তবে এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের অধিক বেগ পেতে হবে না। এই একটি ধর্মব্যবসাকে যদি রুখে দেয়া যায় তবে জঙ্গিবাদ, ধর্মের নামে অপরাজনীতি, ধর্মান্ধতা ইত্যাদি সকল সমস্যা থেকেও আমরা সহজেই পরিত্রাণ পাবো কারণ সকল সমস্যার মূলই হল এই ধর্মব্যবসা। শরীরের ফোঁড়া সারাবার জন্য উপযুক্ত শল্য চিকিৎসার আবশ্যকতা সবচেয়ে
আগে। সেখানে আপোষের কোন প্রশ্নই উঠে না।
.
পরবর্তিতে আমাদের যে কাজটি হবে সেটি হল ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা। ব্রিটিশরা দুই ধরণের শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলনের মাধ্যমে একদিকে মাদ্রসাগামী জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয় ও অপরদিকে সৃষ্টি হয় সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণী। মাদ্রাসা পড়ুয়া জনগোষ্ঠীর হাতে ধর্মব্যবসা করা ছাড়া আর কোন পথ থাকে না কারণ মাদ্রাসা থেকে তাদের তদ্রুপ শিক্ষাই দেয়া হয়। এর ফলে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত জনগণ এক প্রকার বাধ্য হয়েই এ কাজ করে।
অন্যদিকে আমাদের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত যে জনগোষ্ঠী রয়েছে তারা মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতদের অবজ্ঞা করে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ফলে তারা হয়ে উঠে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক। তারা বেশিরভাগই নিজের স্বার্থকে সবার আগে প্রাধান্য দেয় যার ফলে সমাজে চলে অন্যায়, অবিচার ও অশান্তি। ব্রিটিশ প্রবর্তিত এই দ্বৈত শিক্ষা নীতির ফলে আমাদের মাঝে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে কিন্তু তারা প্রত্যেকেই দেশ, সমাজ ও জাতির বদলে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। এর ফলে সমাজে দূর্নীতি হয়, অন্যায় হয়, ঘুষ নেয়া হয় কারণ এই শিক্ষা নীতি তাদের এরূপভাবেই আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর করে গড়ে তুলে।তাই এখন আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে এ বিষয়ে অধিক তৎপর হতে হবে।
.
আমাদের প্রত্যেকের সমন্বিত প্রচেষ্টা এই বিষবৃক্ষ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। সরকার কে ভোটের চিন্তা বাদ দিয়ে সমাজকে রক্ষার চিন্তা করতে হবে। ধর্মব্যবসা আমাদের সমাজের জন্য হানিকারক হলেও ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ঠিক তার বিপরীত কাজ করবে। ইতিহাস ভুললে চলবে না প্রকৃত ইসলামের সংস্পর্শে এসেই আরবের কূপমন্ডুক মানুষগুলো শিক্ষকে পরিণত হয়েছিল, সমগ্র দুনিয়ার জন্য আদর্শ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। তাই এখন আমাদের ধর্মব্যবসা থেকে পরিত্রাণ লাভ করে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাকে আকড়ে ধরতে হবে। প্রকৃত ধর্মের শিক্ষার ফলে একদিকে যেমন সমাজ হবে শান্তিময় অপরদিকে আমরা পূর্বের ন্যায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হতে পারব।
.
(লেখক: সহকারী সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি)

সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

প্রেম

তুমি কবে বুঝবে বলো আমার প্রেমের কথা?
তুমি কবে দেখবে বলো এই মনেরেই ব্যাথা?
তুমি কবে কারণ ছাড়াই আসবে আমার কাছে?
কবে তুমি বাসবে ভালো রইবো তোমার পাশে?
হতচ্ছাড়া ছন্নছাড়া বলবে তুমি হেসে
রাগ করোনা, বলবো আমি তোমায় ভালোবেসে
দেরি করে আসবো যখন আনবো খোঁপার ফুল
গাল ফুলিয়ে বলবে আমায় ভালোবাসাই ভুল।
চোখের কোনে কাজল দিয়ে আসবে যখন তুমি
হাসবো আমি মিটিমিটিয়ে রাগ দেখাবে তুমি
বলবে তুমি, ঢং যে আমার ষোল আনাই জানা
চুপটি করে শুনবো তখন, হাসতে তখন মানা।
তুমি যদি নাই-ই বুঝো এই প্রেমেরই লীলা?
সখি তবে বলো কী-করে মিটবে মনের জ্বালা?
মেমসাহেব হয়ে আসবে তুমি মিলবে মনের সাথে
শুভ্র ফুলের মালা তুমি সুঘ্রাণে মন মাতে।





মসজিদ যখন হেদায়াহবিহীন

শেষ যামানা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রসুল উল্লেখ করেছেন, “এমন সময় আসবে যখন মসজিদগুলো হবে লোকে লোকারণ্য কিন্তু সেখানে কোন হেদায়াহ থাকবে না।” রসুলের এই কথাটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও তাৎপর্যপূর্ণও বটে। ইসলামের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে মসজিদ কিন্তু শেষ যামানায় যখন সেই মসজিদই লোকে লোকারণ্য হওয়া সত্ত্বেও হেদায়াহহীন হবে তখন এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের যথাযথভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

বর্তমানের মসজিদগুলোর ব্যাপারে কাউকে আর নতুন করে বলে দেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। সকলেই জানে বর্তমানে সারা দুনিয়ায় মসজিদের অভাব নেই। জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদগুলোর কোনটি বহুতল বিশিষ্ট, কোনটির সুউচ্চ গম্বুজ, কোনটির সেই গম্বুজ আবার সোনা দিয়ে তৈরি। আমাদের দেশের কথাই যদি চিন্তা করি তবে দেখবো আমাদের ঢাকাকে মসজিদের শহর বলা হয়। এই সকল মসজিদে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লোক নামাজ পড়েন। শুক্রবারে উপচে পড়া অবস্থার সৃষ্টি হয় ও তখন অতিরিক্তি মানুষকে জায়গা দেওয়ার জন্য মসজিদ সংলগ্ন অংশে চাটাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়। বেশিরভাগ মসজিদেই এখন ঝাড়বাতি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রনের সুব্যবস্থা রয়েছে।এক কথায় যদি বলতে চাই তবে মসজিদগুলোকে দেখতে অভিজাত বাড়ি অথবা রাজপ্রাসাদের মতো লাগবে। যে কেউ এর মনোমুগ্ধকর কারূকাজ দেখে আপ্লুত হবে। কিন্তু আল্লাহর রসুল এই লোকে-লোকারণ্য মসজিদগুলোকে হেদায়াহহীন বলে ভবিষ্যদ্বানী করেছেন। এই সাংঘাতিক বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।

সর্বপ্রথম আমাদের জানতে হবে হেদায়াহ কী। হেদায়াহ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হল, কোন দুষ্ট প্রকৃতির গোনাহগার ব্যক্তিকে যদি উপদেশ দিয়ে মদ খাওয়া ছাড়ানো যায়, চুরি ডাকাতি ছাড়ানো যায়, নামাজী বানানো যায় ইত্যাদি আমল করানো যায় তবে মনে করা হয় ব্যক্তিটি হেদায়াহ পেয়েছে। এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। হেদায়াহ অর্থ হচ্ছে সঠিক পথে চলা অর্থাৎ সঠিক দিক নির্দেশনা (Right direction, guidance, orientation)। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বলেছেন, “আমি আমার রসুলকে হেদায়াহ ও সত্যদীন দিয়ে প্রেরণ করেছি (সুরা ফাতাহ ২৮)।” তিনি প্রতিটি যুগেই নবী রসুলের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য হেদায়াহ বা সঠিক পথ প্রেরণ করেছেন। সেই সঠিক পথ কী? সেই সঠিক পথ হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম মানি না। মহান আল্লাহ প্রতিটি নবী রসুলের মাধ্যমেই এই একটি সূত্রই প্রেরণ করেছেন যে সূত্র মেনে নিলে মানবজাতি শান্তিময় একটি পৃথিবী তৈরি করতে পারবে।

আজ আমরা মুসলিম জাতি হেদায়াতে নেই। আমরা বহু আগেই আল্লাহর দেয়া সঠিক পথ, সিরাতুল মুস্তাকিম বা সহজ সরল পথ থেকে দুরে সরে এসেছি। আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কারও হুকুম মানি না এই সূত্র মেনে চলছি না। আল্লাহ এই শেষ দীন ইসলামে সকল বিষয়ের সম্যক ধারণা প্রদান করেছেন। তিনি পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন ইত্যাদি সকল অঙ্গনে মানবজাতি কিভাবে চলবে তার পরিপূর্ণ রূপরেখা শেষ রসুলের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। শেষ রসুল (স.) ও তাঁর সাহাবীরা তা অর্ধ দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে ন্যায় সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল তার জ্বলন্ত সাক্ষী ইতিহাস। কিন্তু আজ আমরা আল্লাহর এই ব্যবস্থায় ছায়াতলে নেই। আমাদের ঘাড়ের উপর বসে আছে পাশ্চাত্য দাজ্জালীয় সভ্যতা। আমরা এই পাশ্চাত্য সভ্যতাকে নিজেদের রব বলে মেনে নিয়েছি এবং তাদের শিখানো তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে আমাদের সমাজ, পরিবার পরিচালনা করছি। আমরা নামাজ, রোজা করে যাচ্ছি এবং ভাবছি আমরা হেদায়েতে রয়েছি কিন্তু আমরা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে বহু আগেই বাদ দিয়ে দিয়েছি। তাই আমাদের মসজিদগুলো আজ পরিপূর্ণ কিন্তু আমরা সঠিক পথে নেই। আমরা যারা সেই মসজিদগুলো পরিপূর্ণ করছি তারা কেউ গণতন্ত্র, কেউ সমাজতন্ত্র, কেউ সরকারীদল, কেউ বিরোধীদল ইত্যাদি বহু তন্ত্র-মন্ত্রের অনুসারী। আমরা একদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার দাসত্ব করে চলেছি ও অন্যদিকে ব্যক্তিগত আমল অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজ করে ভাবছি আমরা হেদায়াতে রয়েছি কিন্তু আসলে আমরা বহু আগেই হেদায়াহচ্যুত দালালাতে অবতীর্ণ হয়েছি ।

এখন আমাদের করণীয় হচ্ছে এই পথভ্রষ্ঠতা থেকে সরে এসে সিরাতুল মুস্তাকিমে উঠা। আমরা যদি আল্লাহর প্রেরিত সূত্র লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোতবেক নিজের ঐক্যসূত্রে গাঁথতে পারি তবে আবার আমরা সমাজে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবো। রসুল শেষ যামানা সম্পর্কে যে কথা বললেন তা আমাদের উপলব্ধিতে আনতেই হবে। আমরা যদি ইবলিসের তথা দাজ্জালের দেখানো পথ থেকে সরে আসতে না পারি তবে আমাদের এত আমল সব তো অর্থহীন হবেই এমনকি আমরা জান্নাতের বদলে জাহান্নামের রাস্তায় অগ্রগামী পর্যায়ে অবস্থান করবো।

(লেখক: সহকারী সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি)

রবিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে

আল্লাহ যে কয়েকটি আসমানী কিতাব মানবজাতির উদ্দেশে প্রেরণ করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হল আল কোর’আন। কোর’আন আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ আসমানী কিতাব যার মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান প্রদান দিয়েছেন। এর আগে যে সকল কিতাব এসেছে তা ছিল কোন নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠির জন্য, কিন্তু এই শেষ কোর’আন এসেছে পুরো মানবজাতির জন্য। কোর’আনে আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতি কিভাবে জীবনযাপন করলে পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এক কথায় জীবনের সকল পর্যায়ে শান্তির সাথে বসবাস করতে পারবে তার উপায় প্রদান করেছেন। কিন্তু আজ মানবজাতির ভিতরে কোর’আন বিদ্যমান কিন্তু কোথাও কোন শান্তি নেই।

আল্লাহর রসুলের একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে তিনি বলেছেন শেষ যামানায় এমন এক সময় আসবে যখন ইসলাম শুধু নাম থাকবে, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, মসজিদগুলো হবে লোকে লোকারণ্য কিন্তু সেখানে কোন হেদায়াহ থাকবে না। আমার উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীব। তারা ফেতনা সৃষ্টি করবে, অতঃপর তাদের ফেতনা তাদের দিকেই ধাবিত হবে (আলী রা. থেকে বায়হাকি, মেশকাত)। বর্তমান সময়ের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তবে দেখতে পাব মুসলিম দুনিয়ায় কোর’আন শুধু অক্ষর হয়ে রয়েছে। আমাদের প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই কোর’আন রয়েছে কিন্তু সে কোর’আনের হুকুম আমাদের সামগ্রিক জীবনের কোনো অঙ্গনে পালন করছি না, ব্যক্তিগতভাবে দু একটা খেয়াল খুশি মতো করার চেষ্টা করছি। ফলে কোর’আন আমাদের সমাজকে শান্তিপূর্ণ করতে পারছে না। আমরা শুধু সেই কোর’আনকে তেলাওয়াতের জন্য গুছিয়ে রাখছি ও ভাবছি তেলাওয়াত করলেই সওয়াব হবে, প্রতিটি অক্ষরে আমরা সওয়াব পাবো। এ কথাটিই রসুল বলেছেন যে, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে। কিন্তু আল্লাহ এই কোর’আনকে শুধু সওয়ার কামাইয়ের জন্য কী নাযিল করেছেন? মোটেও না। আল্লাহ এই সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাবকে সর্বশ্রেষ্ট রসুলের উপর প্রেরণ করেছেন মানুষের সামগ্রিক জীবন পরিচালনা করার জন্য। কোর’আনে স্পষ্ট রয়েছে যারা আল্লাহর নাজেলকৃত বিধান দিয়ে হুকুম করে না তারা কাফের, ফাসেক ও জালেম (সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)।

আজ পৃথিবীতে কোথাও কোর’আনের কোন বিধান চলে না। কোর’আন আজ শুধুই একখণ্ড পবিত্র গ্রন্থ ছাড়া এই জাতির কাছে কিছুই না। কিন্তু আল্লাহর রসুলের অনেক সাহাবী পূর্ণাঙ্গ কোর’আন দেখেন নি। তবুও তাঁরা অর্ধদুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে যে জাতির উপর কোর’আন নাযিল হয়েছে সে জাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সম্বোধন করেছেন। কারণ এই কোর’আনের দিক নির্দেশনা মান্য করলে এ জাতির মধ্যে এমন পরিবর্তন আসবে যার পরিণতিতে তারা জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, সামরিক শক্তিতে, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সমস্ত দুনিয়ায় অন্যান্য জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে এবং এমনটিই হয়েছিল। আমরা ছিলাম শ্রেষ্ঠ জাতি। আমরা ছিলাম শিক্ষকের জাতি। কিন্তু আজ আমরা অন্য জাতির গোলাম। আজ আমাদের ঘরে ঘরে কোর’আন কিন্তু আমাদের সেই জ্ঞান, সেই ঐশ্বর্য নেই।

যেই কোর’আনের সুধা আহরণের মাধ্যমে উম্মতে মোহাম্মদী পুরো অর্ধেক দুনিয়ায় নিজেদের আধিপত্য, জ্ঞান, প্রজ্ঞা বিস্তারে সক্ষম হলো সেই একই কোর’আন আমাদের কাছে রয়েছে। কিন্তু তাঁরা ছিল গতিশীল, কর্মঠ, সাহসীহৃদয়, দুর্বিনীত, বুদ্ধিমান আর আমরা পরিণত হয়েছি ভীরু, অচল, নিথর, কাপুরুষে। আমরা কোর’আন দিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছি। একদল কোর’আনের আয়াতকে গোপন করছে, আয়াতকে বিক্রি করছে, তার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। আরেকদল পাড়া মহল্লা কাঁপিয়ে কোর’আন তেলাওয়াত করছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে কোর’আন নাজিল হলো সেটাই হচ্ছে না। মানবজাতির মুক্তির পথ নিয়ে এসেছিল কোর’আন, মানবজাতিকে সকল অন্যায় অশান্তি থেকে মুক্ত করতে এসেছিল কোর’আন কিন্তু সে কোর’আন আজ নির্জীব মলাটে বন্দী। তাই রসুল বলেছেন, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, এর কোন প্রয়োগ (Implementation) থাকবে না।

সময় কাটে

সময় কাটে  ঘড়ির কাটার সাথে, যখন হয়না কথা জমে নীরবতা।  দূর বহুদূরের পথ,  তোমার আমার হোক শপথ, একসাথে খুঁজব সব গলি। আকাশের কোটি তারা, নিজ পথে...