বর্তমানে আমরা একটি কঠিন সময় অতিবাহিত করছি। পুরো বিশ্ব আজ দাজ্জালীয় সভ্যতার করতলগত। এখানে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই। এখানে শক্তি ও অর্থই সব। অর্থই এখানে সম্মানিত হওয়ার একমাত্র মানদণ্ড। মানুষের মধ্যকার মনুষ্যত্ব আজ ধ্বংসপ্রায়। তাহলে এই যুগসন্ধিক্ষণে এসে আমাদের করণীয় কী? আমাদের একমাত্র করণীয় হচ্ছে এই দাজ্জালীয় সভ্যতাকে ভেঙ্গে একটি নতুন সভ্যতার নির্মাণ করা। একটি পুরাতন জরাজীর্ণ অট্টালিকাকে ভেঙ্গে সেই জায়গায় নতুন একটি অট্টালিকা নির্মাণ চাট্টিখানি কথা নয়।
.
প্রচলিত বিকৃত ইসলামের ধারক-বাহকেরা চায় নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখতে, তারা সুস্থ বিনোদন ও মননে অস্বীকার জানায়, তারা গান-বাজনাকে হারাম বলে ঘোষণা করে। অথচ ইসলামে কোথাও গান-বাজনাকে হারাম করা হয় নি। মানুষের মধ্যকার সুকুমার বৃত্তি আল্লাহই দান করেছেন, সুতরাং ইসলাম এর চর্চাকে হারাম করতে পারে না। ইসলামের ব্যাপারে যদি আমরা কোন মতামত পেশ করি তবে তা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের (স.) জীবনাদর্শ অনুযায়ী হতে হবে।
.
বর্তমানে যারা ইসলামের ধারক-বাহক সেজে বসে আছেন তারা গান-বাজনার নাম নিলেই ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জপতে থাকেন, ভাবটা এমন যেন গান-বাজনা বিশাল পাপের বিষয়। ছোটবেলায় আমরা শুনতাম গান শুনা যাবে না, সিনেমা দেখা যাবে না। কিন্তু এ ধারণার জন্ম হয়েছে সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে দাজ্জালীয় সভ্যতা থেকে আগত অশ্লীলতার সংমিশ্রণের জন্য। কিন্তু উচিত ছিল সংস্কৃতি থেকে অশ্লীলতাকে বিতাড়ন করার চেষ্টা করা। সেটা না করে আমাদের আলেম সমাজ গানকেই হারাম ঘোষণা করে দিলেন। এ যেন মাথা ব্যাথা হওয়ায় মাথা কেটে ফেলা।
.
সঙ্গীত একটি শিল্প। আবহমান কাল থেকেই তা সকল জাতির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ অংশ। আমি পূর্বে বলে এসেছি আমরা একটি কঠিন সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি। এই কঠিন সময়ে যে বিপ্লব প্রয়োজন সেই বিপ্লবের অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে সংগীত। ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই তবে বেশি দূর যেতে হবে না, ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গানগুলো এখনো আমাদেরকে বিপ্লবের চেতনায় উদ্দিপ্ত করে। আজকের এই দুঃসময়ে গান হতে পারে পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার। এজন্য যারা মনে করেন ইসলাম গানকে হারাম করেছে তাদেরকে এ ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।
.
প্রথমেই আমাদের ধারণায় আনতে হবে আল্লাহ কোর’আনে কোথাও গান-বাজনা হারাম করেন নি। যা কিছু হারাম তা মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেই দিয়েছেন। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের জন্য যা হারাম করা হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে (সুরা আল আনআম ১১৯)।” আল্লাহ পবিত্র কোর’আনের কোথাও গান-বাজনার ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন নি। কোর’আনে আল্লাহ মানবজাতির শান্তি-অশান্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় একটি ক্ষুদ্র বিষয়ও বাদ রাখেন নি সেখানে শিল্প সংস্কৃতির চর্চা যা মানবজাতির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সেটি যদি নিষিদ্ধ হতো তা কি তিনি একবারও উল্লেখ করতেন না? অবশ্যই তিনি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান জানিয়ে দিতেন। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে অসার বাক্যালাপ করতে নিষেধ করেছেন (সুরা লোকমান-৬)। ইসলামের অতি-বিশ্লেষণকারী পণ্ডিতরা এই ‘অসার বাক্যালাপ বা লাহওয়াল হাদিস’ কথাটিকে ব্যাখ্যা করে গান বানিয়ে দিয়েছেন এবং দাবি করছেন যে এখানে গান গাইতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের এই ব্যাখ্যা যে সম্পূর্ণ মনগড়া তার প্রমাণ রসুলাল্লাহর জীবন।
.
রসুলাল্লাহ (স.) এর জীবন থেকে যদি আমরা দেখি তবে স্পষ্ট দেখবো তিনি সুস্থ বিনোদন, আনন্দ উৎসব ও গান-বাজনা ইত্যাদি বর্জন করেন নি। তাঁর নবী হওয়ার পর থেকে সমগ্র জীবনটাই কেটেছে সংগ্রামে আর যুদ্ধে, হাজারো ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। মাত্র ২৩ বছরে তাঁকে ৭৮ টি যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে যেখানে অনেকগুলোতেই তিনি নিজে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। এমন একজন বিপ্লবীর পক্ষে সারাদিন ঘরে বসে থেকে গান শোনা সম্ভব হয় নি, তবুও তিনি চিত্তবিনোদনের জন্য গান শুনেছেন।
.
হাদিসে রয়েছে, “রসুল (স.) একদিন মদিনার গলিপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কয়েকটি বালিকা দফ বাজিয়ে গান গেয়ে বলছিলো, আমরা বনু নাজ্জারের বালিকার দল, কত খোশনসীব! মুহাম্মদ (স.) আমাদের প্রতিবেশী। তখন আল্লাহর রসুল বলেন, আল্লাহ অবগত আছেন, আমি তো তোমাদের ভালোবাসি (সুনানে ইবনে মাজাহ)।” অন্যত্র দেখা যায়, আবু বোরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত, “একদিন রসুলাল্লাহ যুদ্ধ থেকে ফিরার পর একজন কালো বর্ণের তরুণী তাঁর কাছে হাজির হলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসুল, আমি মানত করেছিলাম যে আল্লাহ যদি আপনাকে সহিহ সালামত যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরিয়ে আনেন তবে আমি আপনার সামনে দফ বাজাবো ও গান গাইবো। আল্লাহর রসুল জবাব দিলেন, তুমি যদি মানত করে থাকো তবে তা পূর্ণ করো। অতঃপর তরুণীটি গান গাইতে শুরু করলো। এই সময় আবু বকর (রা.) প্রবেশ করলেন তবুও সে বাজাতে থাকলো, হযরত আলী (রা.) প্রবেশ করলেন তবুও সে থামলো না, হযরত উসমান (রা.) প্রবেশ করলেন এবং তখনও সে বাজাচ্ছিল। কিন্তু যখনই উমর (রা.) উপস্থিত হলেন তরুণীটি তার দফ নামিয়ে রাখলো। আল্লাহর রসুল তখন বললেন, হে উমর! শয়তানও তোমাকে ভয় পায়। আমি বসে ছিলাম আর এই তরুণীটি দফ বাজিয়ে গান করছিলো, আবু বকর, আলী যখন প্রবেশ করে তখনও সে বাজাচ্ছিলো, উসমান আসার পরই সে থামেনি কিন্তু যখনই তুমি আসলে সে দফটি রেখে দিল (তিরমিযি শরীফ, দ্বিতীয় খণ্ড)। আল্লাহর রসুলের জীবনে এরূপ ঘটনার অভাব নেই যেখানে তিনি গান শুনেছেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, “একদিন আবু বকর (রা.) তাঁর নিকট এলেন। এ সময়ে মিনার উৎসবের দিনগুলোর একটি দিনে তাঁর নিকট দুটি মেয়ে দফ বাজাচ্ছিল। নবী (স.) তাঁর চাদর আবৃত অবস্থায় শুয়েছিলেন। তখন আবু বকর (রা.) মেয়ে দুটিকে ধমক দিলেন। তখন আল্লাহর রসুল মূখমÐল থেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, হে আবু বকর, তাদের বাধা দিও না, এটা তাদের ঈদের দিন (সহিহ বোখারী)।” এছাড়াও “মোহাম্মদ বিন হাতবি (রা.) বর্ণনা করেছেন, রসুলাল্লাহ (রা.) বলেছেন, হালাল ও হারাম বিবাহের মধ্যে পার্থক্য হলো ঢোল বাজানো ও শব্দ করা বা ঘোষণা প্রচার (সুনানে আবু দাউদ)।”
.
তাহলে রসুলের জীবনী থেকেও আমরা স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছি যে তিনি গান শুনেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র সহযোগেই শুনেছেন। অনেকেই দাবি করেন বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে শুধু দফ হালাল আর অন্য সকল বাদ্যযন্ত্র হারাম। কিন্তু এ ধারণাটিও সঠিক নয়। আমাদের তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। মদিনা একটি কৃষিপ্রধান গ্রাম্য এলাকা। সেই এলাকার মানুষজন কৃষিজীবি তাই তারা ফসল কাটার গান, গ্রাম্য পরিবেশের গান অর্থাৎ আমাদের ভাটিয়ালী গানের মতো গানগুলো গাইতেন। সেই সকল গান গাওয়ার জন্য তারা নিজস্ব সহজলভ্য বাদ্যযন্ত্রগুলোই ব্যবহার করতেন। যেমন আমাদের দেশে গ্রামগঞ্জে এখনো একতারা, ডুগি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। আল্লাহর রসুল কোন বাদ্যযন্ত্রের উপরই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। যদি করতেন তবে তিনি দফের উপরেই আরোপ করতে পারতেন। অতএব যারা দাবি করেন যে দফ ছাড়া অন্যান্য সকল বাদ্যই হারাম তারা আসলে তাদের জ্ঞানের সংকীর্ণতার পরিচয় দেয়। আর একটি বাদ্যযন্ত্র বাজানো জায়েজ হওয়ার অর্থ সকল বাদ্যযন্ত্রই জায়েজ হওয়া- এটা সাধারণ জ্ঞান। আল্লাহর রসুল তীর-ধনুক, ঢাল তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করেছেন। এর অর্থ হলো যুদ্ধে তিনি সমসাময়িক যুগের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। আজ যখন তাঁর উম্মাহ যুদ্ধ করবে তখনও কি তারা তীর-ধনুক আর ঢাল-তলোয়ার দিয়েই যুদ্ধ করবে? অবশ্যই নয়। তাদেরকেও সমসাময়িক যুগে উপযোগী অস্ত্রসস্ত্রই ব্যবহার করতে হবে।
.
তবে হ্যাঁ, অশ্লীলতাকে ইসলাম অবশ্যই হারাম ঘোষণা করেছে। পবিত্র কোর’আনে রয়েছে, “আল্লাহ মন্দ কাজের আদেশ দেন না (সুরা আরাফ ২৮)।” তাহলে যে সকল গান সমূহের মাধ্যমে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো হয় সে সকল গান অবশ্যই হারাম। তবে দেশ ও জাতির কল্যাণে, মানুষের মধ্যকার সৃজনশীলতা বিকাশে, সুস্থ বিনোদনের জন্য গান অবশ্যই হালাল। তাই আশা করছি যারা এতদিন ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করতেন তাদের ধারণার পরিবর্তন আসবে এবং ইসলামের উদারতা তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।
ইন্নালিল্লাহ! দ্বীনের এসব কী বিকৃতি করেছেন?
উত্তরমুছুনস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ ও যুক্তির উপস্থাপন দেখেও বলছেন বিকৃতি?
উত্তরমুছুন